বিপুল অঙ্কের দেশি-বিদেশি দেনা মাথায় নিয়ে যাত্রা শুরু করা নতুন সরকার বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। পবিত্র রমজান মাসের পরপরই শুরু হতে যাওয়া সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ, যেখানে বর্তমানে চাহিদা ১৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘আর্থিক দেউলিয়াত্ব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে বিদ্যুৎ খাতকে পুরোপুরি আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। অনেক বকেয়া ও দেনা জমে আছে। জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এখন এক ধরনের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো।’ তিনি জানান, গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো সচল রেখে চাহিদা পূরণের পরিকল্পনা থাকলেও জ্বালানি আমদানির বিষয়টি অত্যন্ত জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কাটাতে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জ্বালানি আমদানির সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের ডলার মজুদের ওপর। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি রয়েছে। তিনি জানান, সক্ষমতা থাকলেও ডলার সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় জ্বালানি (এলএনজি, কয়লা ও তেল) আমদানি করা না গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে। তার হিসেবে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রতি বছর প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে সংস্থান করা কঠিন।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সংগঠন ‘বিপপা’ জানিয়েছে, গত সাত-আট মাস ধরে তারা বিল পাচ্ছে না, যার ফলে তেল আমদানির জন্য এলসি খোলা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। জানুয়ারিতে যেখানে তেলের মজুদ ছিল এক লক্ষ মেট্রিক টন, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তা কমে ৮০ হাজার টনে নেমে এসেছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা মিশ্র মত দিয়েছেন। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতিকে দায়ী করে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বন্ধের পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করলে সাশ্রয় হওয়া অর্থ দিয়ে কয়লা আমদানি করে চাহিদা মেটানো সম্ভব। তবে ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, পিক আওয়ারে চাহিদা মেটাতে এবং শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ ঠিক রাখতে আপাতত তেলভিত্তিক কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ করা অসম্ভব। বিদ্যুৎ মন্ত্রী জানিয়েছেন, রমজান ও সেচ মৌসুমে মানুষের কষ্ট লাঘবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত কিছু বকেয়া পরিশোধ এবং জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।