একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একত্রিত করে বিদ্যমান নগদ সহায়তার লক্ষ্য নির্ধারণ আরও কার্যকর করার পাশাপাশি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ’ প্রতিবেদনে এ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংক বলেছে, সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো জরুরি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিও স্থবির হয়েছে এবং বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বর্তমানে সবচেয়ে দরিদ্র প্রায় অর্ধেক পরিবার কোনো না কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাইরে রয়েছে। ফলে সরকারি সহায়তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
সংস্থাটি বলেছে, খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচিগুলো একত্রিত করা, নগদ সহায়তার সুবিধাভোগী নির্বাচন আরও কার্যকর করা এবং এর সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড যুক্ত করা হলে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়বে। এতে সরকারি সম্পদের অপচয় কমার পাশাপাশি প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগও বাড়বে।
এ ক্ষেত্রে ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। এর মাধ্যমে প্রমাণভিত্তিকভাবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকিও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে ভূমিকা রাখে। তবে কারা এসব সুবিধার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে, তা সঠিকভাবে শনাক্ত করা না গেলে সীমিত সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন।
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে। বিনিয়োগ কমে যাওয়া, রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনীতিতে চাপ অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণও দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ২০২৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ রাজস্ব আদায় হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এদিকে খেলাপি ঋণের হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। রাজস্ব ঘাটতিও ২০২৫ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠেছে।
তবে শক্তিশালী প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধির কারণে দেশের বহির্বিশ্বমুখী অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ও সংস্কার কর্মসূচির গতি বাড়ানো গেলে ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জ্যাঁ পেসম বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে দরিদ্রদের সুরক্ষা এবং উন্নত কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এসব সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।