জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, তাদের কেউ দলীয় পদ বা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করতে পারবেন না। করলে তা অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৮০ বছর দলটির নেতাকর্মীরা এ নিয়ম মেনে চললেও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বেশ কিছু নেতার মধ্যে এই নিয়ম ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। সাংগঠনিক নিয়ম অমান্যের ফলে ‘বড় দল’ হয়ে উঠতে চাওয়া জামায়াতের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে শুরু করেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় নির্দেশ অমান্য করায় জামায়াতের তিন প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সুনামগঞ্জ ও নরসিংদী জেলা কমিটি বিলুপ্ত করে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে এরপরও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলসমর্থিত প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে বিভিন্ন স্থানে তৎপরতা চালাচ্ছেন তৃণমূলের নেতারা।
এ প্রবণতা নিয়ে কথা বলেছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। গত ১৬ মে রংপুরে দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমাকেই জনপ্রতিনিধি হতে হবে— এ রকম চিন্তা যদি কারও মাথায় আসে, তাহলে তিনি ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হওয়ার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলবেন।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান মনে করেন, দীর্ঘদিন ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন হিসেবে পরিচালিত হলেও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াত দ্রুত বড় দলে পরিণত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ফলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভাঙার প্রবণতাও বেড়েছে।
জামায়াতের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই পরিস্থিতি তাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। ক্ষমতার রাজনীতিতে বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আদর্শিক কাঠামো ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ক্ষমতার আকর্ষণে দলে আসা সবাই আদর্শিকভাবে সংগঠনের নীতির সঙ্গে একমত নাও হতে পারেন।
দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব আবদুল হালিম বলেন, স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় হলেও দল একটি করে সমর্থিত প্রার্থী নির্ধারণ করবে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, কেউ সরাসরি সদস্য হতে পারেন না। পর্যায়ক্রমে সহযোগী সদস্য, কর্মী এবং পরে রুকন হওয়ার জন্য ধর্মীয় শিক্ষা, সাংগঠনিক কার্যক্রম ও নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনেও গোপন ভোটের মাধ্যমে দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয় এবং কোনো প্রার্থী নিজের জন্য প্রচারণা চালাতে পারেন না।
তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই কাঠামোতে কিছুটা শিথিলতা এসেছে। নির্বাচনের আগে দ্রুত সাংগঠনিক বিস্তারের কারণে আগের মতো কঠোর যাচাই-বাছাই সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় নেতৃত্ব, প্রার্থী নির্বাচন এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে মতবিরোধ ও সংঘাতের ঘটনাও সামনে এসেছে। দলীয় নেতাদের মতে, ক্ষমতার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে জামায়াত।
এদিকে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা বারবার দাবি করেছেন, শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “মানুষ হিসেবে পদের আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে, কিন্তু দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তাতে জামায়াত তথাকথিত বড় দল হতে না পারলেও সমস্যা নেই।”