প্রায় দুই দশক পর বিএনপি জোট আবারও ক্ষমতায় এসেছে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তারেক রহমান। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সুযোগ পেলেও সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্বল অর্থনীতি।
এই বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ জাতীয় সংসদে ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে বাজেট উপস্থাপন করবেন।
প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার মনে করছে, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা গেলে অর্থনীতির বর্তমান স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
বাজেটে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, ডিজিটাল কনটেন্ট, গবেষণা, সংস্কৃতি, স্টার্টআপ ও জ্ঞানভিত্তিক শিল্পকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পেশাদার স্বাধীনতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
জনজীবনের চাপ কমাতে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, আলু, পেঁয়াজ ও রসুনসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎস কর কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ড কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি, গবেষণা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বাজেট বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে রাজস্ব আহরণকে। আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ ও রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
ঘাটতি অর্থায়নের জন্য ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বৈদেশিক উৎস থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ নেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের প্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে।
জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ ১ লাখ ২৭ হাজার ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারের মতে, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্য অস্থিরতার মধ্যে এই ব্যয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে প্রায় ৫৭ হাজার ৩০২ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে প্রায় ৪৯ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা, রাজস্ব আদায়ের কার্যকারিতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর।