দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ব্যবসায়ী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈঠকে সংকটের পূর্ণ সমাধান না হলেও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা সংকট মোকাবিলায় সরকারের কাছ থেকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা চান। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং শিল্পে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে দ্রুত সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলারের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানার অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করা এবং সরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় দ্রুত রুফটপ সোলার স্থাপন। পাশাপাশি জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, তেলভিত্তিক কেন্দ্র দ্রুত বিদ্যুৎ দিতে পারলেও দীর্ঘ সময় একটানা চালানো সম্ভব নয়। তাই সরকারি স্থাপনাগুলোতে রুফটপ সোলার স্থাপনকে তুলনামূলক দ্রুত সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কম থাকায় এর মাধ্যমে দ্রুত গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ করার সুযোগ রয়েছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্পখাতের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে একটি পরিষ্কার কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। পরিস্থিতি কত দিনে স্বাভাবিক হতে পারে, তা জানা গেলে ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ও রপ্তানি পরিকল্পনা সেভাবে সাজাতে পারবেন।
বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসনাতের মতে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়িয়ে গ্যাসভিত্তিক কিছু কেন্দ্রের ওপর চাপ কমানো গেলে শিল্পখাতে অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তার ধারণা, সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ছোট পরিসরে কার্যকর বৈঠক হলে বর্তমান পরিস্থিতির ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নতি সম্ভব।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানও সংকট মোকাবিলায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পাশাপাশি কিছু গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের গ্যাস শিল্পখাতে সরিয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে আরও কার্যকরভাবে উৎপাদনে আনা গেলে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়ে অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং দ্রুত উৎপাদনযোগ্য গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, সরকারকে সব অংশীজনের বক্তব্য শুনে দ্রুত বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সংকট সামাল দিতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।