ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার মতো সরকারি উদ্যোগ নারীদের সম্ভাবনা ও সুযোগ বাড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। একই সঙ্গে দেশের ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণে নারীস্বাস্থ্য খাতে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব ও উদ্ভাবনী অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (১১ অক্টোবর) জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের ‘দ্য মোমেন্ট ইজ নাউ: এইডের বাইরে নারীস্বাস্থ্যে নতুন অর্থায়নের সুযোগ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, প্রচলিত উন্নয়ন সহায়তা দিয়ে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন উদ্ভাবনী অর্থায়ন, জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সহজ শর্তে বিনিয়োগ, অনুদানভিত্তিক কারিগরি সহায়তা এবং টেকসই অভ্যন্তরীণ সম্পদের সমন্বয়।
তিনি আন্তর্জাতিক অংশীদার, উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের বাংলাদেশের নারীস্বাস্থ্যসেবা জোরদারে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তাঁর মতে, বিচ্ছিন্ন ও স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের পরিবর্তে শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপ দেওয়া জরুরি।
নারীস্বাস্থ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। তাই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নারীস্বাস্থ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। নারীস্বাস্থ্যে বিনিয়োগ কেবল চিকিৎসাসেবায় ব্যয় নয়; এটি মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ।
তিনি জানান, মাতৃস্বাস্থ্যের প্রচলিত সেবার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি কিশোরীদের রক্তস্বল্পতা, মাতৃ অপুষ্টি, প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু এবং নারীদের প্রাণঘাতী ক্যানসার মোকাবিলায় বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।
মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে দেশব্যাপী এক লাখ কমিউনিটি ও কল্যাণকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশই হবেন নারী। পাশাপাশি আরও ২৫ হাজার পেশাদার ধাত্রী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব উদ্যোগের লক্ষ্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক প্রসব উৎসাহিত করা, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা হস্তক্ষেপ কমানো এবং প্রত্যেক নারীর জন্য দক্ষ ও সহানুভূতিশীল মাতৃত্বকালীন সেবা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, কোনো নারীর নিরাপদে সন্তান জন্ম দেওয়ার সুযোগ তাঁর আর্থিক সামর্থ্য কিংবা ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে প্রয়োজনীয় ও সমন্বিত মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সমতা, মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়নে উদ্যোগের গুরুত্ব
নারীর ক্ষমতায়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা তুলে ধরেন জুবাইদা রহমান। তিনি বলেন, গ্রামীণ উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা ও জনগণের অংশগ্রহণের ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি নারীশিক্ষা সম্প্রসারণে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের সুফল নারীরা পেয়েছেন।
বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের উপবৃত্তি চালুর ফলে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বর্তমান সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও বিনামূল্যে শিক্ষার উদ্যোগও নারী ও মেয়েদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নারীস্বাস্থ্য উদ্যোগে ২৫ কোটি ইউরোর ঋণ পুনর্বিন্যাস
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ২৫ কোটি ইউরোর একটি সার্বভৌম ঋণ নারীস্বাস্থ্য উদ্যোগে ব্যবহারের জন্য পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে চুক্তি ঘোষণার কথা জানানো হয়েছে।
এই উদ্যোগের আওতায় ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরীকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে অংশীদার হিসেবে কাজ করবে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল।
এ উদ্যোগে সহযোগিতার জন্য ইউএনএফপিএ ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান জুবাইদা রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি মেয়ের নিরাপদ শৈশব, প্রতিটি মায়ের নিরাপদে সন্তান জন্ম দেওয়ার সুযোগ এবং প্রতিটি নারীর দীর্ঘ ও উৎপাদনশীল জীবন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের ওই অধিবেশনে সরকার, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা, উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল টেকসই স্বাস্থ্য অর্থায়ন, ধাত্রীবিদ্যা এবং নারী ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করে।