প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে বিএনপির নেতৃত্বে এসেছে তিন প্রজন্ম। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত দলটির নেতৃত্ব তাঁর মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় ধরে সামলেছেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর মৃত্যুর পর এখন দলের নেতৃত্ব প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে। শুরু হয়েছে দলটির নতুন অধ্যায়।
রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রাক্কালে নতুন নেতৃত্বকে আরও সুসংহত করা, তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা, সংগঠনকে গতিশীল করা এবং সরকারের বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা করে জনগণের আস্থা ধরে রাখাই তারেক রহমানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারকের মতে, নানা সংকট ও প্রতিকূলতার মধ্যেও দলটি বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দীর্ঘ সময় পর আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ তৈরি হয়েছে। তবে এই রাজনৈতিক সুসময়কে দীর্ঘস্থায়ী করতে সরকারের কার্যক্রম ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখার ওপরই এখন বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য আবেগের দিক থেকেও আলাদা। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এটিই দলের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এতদিন জাতীয় ও দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের কাছে তাঁর উপস্থিতি ছিল অনুপ্রেরণার বড় উৎস। এবার সেই শূন্যতা অনুভব করলেও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমান দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
দলটির নেতারা মনে করেন, সাধারণ জীবনযাপন ও জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ডের কারণে তারেক রহমানের প্রতি তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে। ভবিষ্যতে তরুণ ও মেধাবীদের আরও বেশি বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তরুণদের সম্পৃক্ত করার চ্যালেঞ্জ
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই মেধাবী তরুণরা বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বেও আগামী দিনে আরও বেশি তরুণ ও মেধাবী মানুষ রাজনীতিতে যুক্ত হবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং বিএনপির ৩১ দফার সমন্বয়ে দলের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে এর বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে তাঁর মতে, আগের সরকারের রেখে যাওয়া কিছু সংকট এখনো রয়েছে। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ক্ষমতায় এসে বড় পরীক্ষার মুখে বিএনপি
সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আওয়ামী লীগ আমলের গুম-খুনের বিচার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংশোধন, বিরোধী দলের আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণহত্যার বিচার।
দলের নেতাদের মতে, এসব বিষয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারাই হবে বিএনপির জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখার অন্যতম প্রধান পরীক্ষা।
মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, শুধু রাজনৈতিক স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কাজের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক রাজনীতির উত্তরাধিকার এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বকে সামনে রেখে বিএনপিকে এগিয়ে নিতে হবে।
৪৮ বছরের পথচলা
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড, এরশাদবিরোধী আন্দোলন, একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া এবং ওয়ান-ইলেভেনের মতো প্রতিকূলতা পেরিয়ে দলটি টিকে রয়েছে।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্বে আসেন এবং দীর্ঘ সময় বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি লন্ডন থেকে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নেতৃত্ব দেন।
দলের নেতাদের মতে, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রেখে বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী বিএনপিকে নতুনভাবে গড়ে তোলাই এখন তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।
প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকার পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া বিএনপির সামনে এখন নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সুযোগ এসেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি—এসব বিষয় সরকারের কার্যকারিতা মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে।
তরুণদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি দলীয় সংগঠনকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করা এবং জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সরকারের কর্মকাণ্ডের সমন্বয় ঘটাতে পারলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন যুগ আরও শক্তিশালী ভিত্তি পেতে পারে। তবে প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে বর্তমান রাজনৈতিক সুসময়ই নতুন চ্যালেঞ্জে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।