দেশের চলমান জ্বালানি ও গ্যাস সংকট বর্তমান সরকারের সৃষ্টি নয় বলে মন্তব্য করেছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তবে সংকট সমাধানে সরকারের আন্তরিকতা থাকলেও জনগণের দুর্ভোগ কমছে না, বরং দিন দিন বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ৬৮ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। তার বক্তব্যে জ্বালানি ও গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানার ক্ষতি এবং অর্থনীতিতে এর প্রভাবের বিষয়টি উঠে আসে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকট দীর্ঘদিনের এবং ধারাবাহিকভাবে জমে থাকা সমস্যাগুলো বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ সংকট মোকাবিলায় দেশের সব পক্ষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, দেশে গৃহস্থালি, বাণিজ্যিক ও শিল্প—এই তিন শ্রেণির গ্রাহক রয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, গত তিন বছরে সংকটের কারণে ৪০০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, কারখানা বন্ধ হওয়ায় উদ্যোক্তারা ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে খেলাপি হচ্ছেন। এর সঙ্গে লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানও জড়িত। অনেক কারখানায় জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
উৎপাদন কমে গেলে বিদেশি ক্রেতাদের সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। এতে ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে চলে যেতে পারেন এবং বাংলাদেশ রপ্তানি বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছে বলেও জানান।
বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান চার উৎস মিলিয়ে সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। অথচ গত আগস্টে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। এরপরও প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তার মতে, উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সরকারের কাছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা পাওনা থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। এই বকেয়া দীর্ঘদিন ধরে জমে বড় অঙ্কে পরিণত হয়েছে বলেও জানান।
জ্বালানি সরবরাহে গ্যাসের ওপর নির্ভরতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় দেশের গ্যাসের প্রায় ৮০ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে এবং ২০ শতাংশ আমদানি থেকে আসত। বর্তমানে আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। পুরোনো গ্যাসকূপের চাপ কমে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন কূপ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দীর্ঘদিন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা। তার বক্তব্য, প্রতিবেশী দেশগুলো একই সমুদ্রসীমা থেকে গ্যাস উত্তোলন করে সুফল পাচ্ছে। বাংলাদেশেরও সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধানে সম্ভাব্য বাধা চিহ্নিত করে তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এ সময় বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে অতীতে বিপুল পরিমাণ কয়লা গায়েব হওয়ার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেন ডা. শফিকুর রহমান। অতিরিক্ত কয়লা অন্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা যায় কি না, সে বিষয়ে কারিগরি বা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্যাস, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানি উৎসের যথাযথ ব্যবহার এবং নতুন উৎস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।