১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা থেকে রাজনীতির শীর্ষে উঠে এসে একটি নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি ও নানা রাজনৈতিক সমীকরণ।
১৯৭৫ সালের নভেম্বরে এক ভাষণে জিয়াউর রহমান নিজেকে ‘রাজনীতিবিদ নন, একজন সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। এর পরের বছর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় নিজেকে ‘শ্রমিক’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে এর মধ্যেই তিনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৯৭৭ সালের ২২ মে ‘আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে’ ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন জিয়াউর রহমান। উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া এই কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করার চেষ্টা করেন।
এরপর নিজের প্রতি জনসমর্থন যাচাই করতে গণভোটের আয়োজন করা হয়। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, ভোটারদের ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ জিয়ার পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। তবে সে সময় ভোটার উপস্থিতি ও ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্নও ওঠে।
একই সময়ে জিয়াউর রহমান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। তার উপদেষ্টামণ্ডলীতে কয়েকজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকেও যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ নেন তিনি।
১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’—জাগদল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। জিয়াউর রহমান প্রকাশ্যে দলটির নেতৃত্বে না থাকলেও এর পেছনে তার রাজনৈতিক উদ্যোগ ছিল। পরে জাগদলকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন করা হয়।
১৯৭৮ সালের ১ মে জিয়াউর রহমানকে চেয়ারম্যান করে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। একই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ৭৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের ভেতরে মতপার্থক্য ছিল। ফলে জিয়াউর রহমান শেষ পর্যন্ত একটি নতুন, অপেক্ষাকৃত ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন।
দলটির নাম নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাবের পর শেষ পর্যন্ত ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ নামটি নির্ধারণ করা হয়। ১৯৭৮ সালের ২৮ আগস্ট জাগদল বিলুপ্তির ঘোষণা দেওয়া হয়।
এর কয়েক দিন পর, ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গণে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউর রহমান বিএনপির নাম, গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। এভাবেই সামরিক কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রপতি এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে।
গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের বই ‘বিএনপি সময়-অসময়’-এ বিএনপির জন্মপ্রক্রিয়াকে বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দল গঠনের ধারার তুলনায় ব্যতিক্রম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বইটিতে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান, জাগদল ও জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠনের নেপথ্যের বিভিন্ন ঘটনাও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।