বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় বর্তমান পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে সংস্থাটি। মূলত বিশাল সংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া, টিকাদানের ঘাটতি এবং হামের উপসর্গে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকায় ডব্লিউএইচও গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তাদের প্রতিবেদনে এই জরুরি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে।
এর আগে গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানিয়েছিল যে, দেশের অভ্যন্তরে চলমান সংক্রমণের কারণে রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি জনস্বাস্থ্যবিদদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, যার প্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা দেশে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত এক মাসেই দেশে ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৯৭৩ এবং একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৬ জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এই প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় রয়েছে ঢাকা বিভাগ। বিশেষ করে রাজধানীর ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল ও মিরপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকাগুলোতে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি। এছাড়া রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগেও উল্লেখযোগ্য হারে সংক্রমণ বাড়ছে। দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির তথ্য বলছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৮৩ শতাংশেরই বয়স ৫ বছরের নিচে, যা শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতার চরম ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ যা বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। আক্রান্তদের মধ্যে উচ্চ জ্বর, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ির মতো লক্ষণ দেখা দেয়। সাধারণ মনে হলেও হাম থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৪-২৫ সালে দেশে হাম-রুবেলা টিকার তীব্র সংকটের কারণে অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে। মূলত এই টিকাদানের ফাঁক এবং নিয়মিত সম্পূরক কর্মসূচির অভাবেই বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর ফলে হাম নির্মূলে বাংলাদেশের অর্জিত আগের সাফল্য এখন বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে।
জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি এই ঝুঁকি এখন আঞ্চলিকভাবেও ‘উচ্চ’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ স্থলসীমান্ত থাকায় এবং সীমান্ত দিয়ে মানুষের নিয়মিত যাতায়াত চলমান থাকায় সংক্রমণ দেশের বাইরে ছড়িয়ে পড়ার বা বিদেশ থেকে নতুন করে প্রবেশের শঙ্কা বাড়ছে।
বিশেষ করে যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো সীমান্ত শহরগুলো ভারতের সঙ্গে ব্যস্ত স্থলবন্দর ভাগ করে নেওয়ায় এই ঝুঁকি আরও প্রবল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সব এলাকায় অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছে। তারা বলছে, যারা আগে টিকা নেয়নি বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনা জরুরি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ইতোমধ্যে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। গত ২০ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া আক্রান্ত শিশুদের নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি ভিটামিন এ ক্যাপসুল দেওয়া হচ্ছে। জেলা পর্যায়ের দ্রুত প্রতিক্রিয়া দলগুলো বর্তমানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দ্রুত টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা নিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল টিকাদান নয়, বরং হাসপাতালের প্রস্তুতি বাড়ানো, রোগীকে আলাদা রাখা এবং নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমেই এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এই সংক্রামক ব্যাধি আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।