কেউ উদ্বেগের বাইরে নয়
নতুন বছরটা কেমন যাবে তার একটা আভাস পাওয়া গেছে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের পর। একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে সুরক্ষিত ভবন থেকে ধরে উঠিয়ে নিয়ে গেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এর চাইতে দস্যুবৃত্তি আর কি হতে পারে?
এটা কি কেবল ভেনেজুয়েলার বিপর্যয়?
এই ঘটনা দুনিয়াব্যাপী ছোট বড় সকল দেশের জন্য হুমকি, সকলের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।
আমেরিকার এই দস্যুবৃত্তি এটাই নতুন নয়, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, পানামার নরিয়েগার কথা ভুলে যাওয়ার কথা নয়।
ইরাকের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি সাদ্দাম হোসেনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুরো দেশটাকে তামা বানিয়ে ফেলেছে। হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে। সকল স্থাপনা মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে সে রকম দেশ দখল করতে হয়নি। প্রযুক্তির সক্ষমতা বেড়েছে।
মাদুরোকে আটকের আগে দেশটির রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হামলা চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিমান ঘাঁটি, সামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর ও টেলিকম টাওয়ারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপানায় হামলা চালানো হয়েছে।
আমেরিকা কোন দেশে অভিযানের আগে যে কয়েকটা কাজ করে ভেনেজুয়েলায়ও সে দুটো কাজ করেছে। প্রথমত, দেশের অভ্যন্তরে একটা তাঁবেদার গোষ্ঠী তৈরি করা অন্যটি হচ্ছে একটা ছুতা খুঁজে বের করা।
তাঁবেদার তৈরির জন্য আমেরিকা প্রচুর অর্থ খরচ করে, মিডিয়ার পিছনেও বিনিয়োগ করতে কার্পণ্য করে না। ভ্যানেজুয়েলায় আমরা দেখলাম মাচাদো নামের এক নারীকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হলো, পুরস্কার পেয়েই তিনি মাদুরোর বিরুদ্ধে লেগে গেলেন। কেবল মাচাদো নয়, সরকারের মধ্যে তাঁবেদার ছাড়া এতো নিখুঁত পরিকল্পনা করে প্রেসিডেন্টকে জীবিত ধরে নেয়া সম্ভব হতো না।
ইরাকে যেমন বিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগ করা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও সে রকম একটা অভিযোগ দাড়করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মাদুরো আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত। আসল সত্য হচ্ছে দেশটি মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত নয়, তবে কলোম্বিয়া থেকে তাদের দেশ হয়ে আমেরিকায় পৌছায়। এই কাজটা রাশিয়ার ইন্দনে হয়ে থাকে, আমেরিকার যুবকদের ভিতর থেকে ধসিয়ে দিতে রাশিয়া এই কাজটা করে।
অভিযানের আগে আরো একটা কাজ আমেরিকা করে, এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দিয়ে অর্থনীতিকে পঙ্গু করে তোলা যাতে সাধারণ মানুষ ক্ষেপে থাকে।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটিযেছে, দীর্ঘ দিন ধরে দেশটির ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে আসছে।
ইরাক বা অন্য দেশের ক্ষেত্রে অভিযানের লক্ষ্য সরাসরি না বললেও এবার কোন রাখঢাক করেনি।
প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে একটি তাঁবেদার সরকার বসানোর ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ রদবদল না হওয়া পর্যন্ত আমরাই দেশটি চালাবো।
তিনি আরো বলেন, ভেনেজুয়েলার জনগণ আবারও স্বাধীন এবং দেশটি পরিচালনায় উপযুক্ত মানুষ বাছাই করার কাজ চলেছে।’
গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মাদুরো সরকারকে উৎখাতে পরিকল্পনা করতে থাকে। গত সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন নৌবাহিনী ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছাকাছি নৌবহর মোতায়েন করতে থাকে। মাদক পাচারের অভিযোগে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে নৌযানে হামলা চালানো হয়। এ সময় তারা ভেনিজুয়েলার তেলবাহী জাহাজও আটক করে নিয়ে যায়। মূলত ওইসব হামলার লক্ষ্য ছিল ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ কব্জা করা। জাহাজের তেল কি করা হবে এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন, জব্দ করা তেল নিয়ে যাওয়া হবে।
মাদুরো সরকারকে উৎখাতে কেন ট্রাম্প মরিয়া তা গোপন করা হয়নি। মাদুরোকে তুলে আনার পরপরই ট্রাম্প বলেছেন, ‘মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনিজুয়েলার অবকাঠামো মেরামত করতে এবং দেশের জন্য অর্থ অর্জন শুরু করতে যাবে।’
ভেনেজুয়েলার উপর মার্কিন চাপ বা আগ্রাসন নতুন কিছু নয়। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরেই ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ ও আগ্রাসন দেখিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৯ হুগো চাভেজ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেন। সেগুলো সুনজরে দেখেনি যুক্তরাষ্ট্র। হুগো শাভেজ যে সংস্কার আন্দোলন হাতে নেন তাকে বলা হয় বলিভিয়ার বিপ্লব। বলিভিয়ারা বিপ্লবের অংশ হিসেবে সংবিধান সংস্কার ও তেল খাতের জাতীয়করণ করেন। তেল খাত জাতীয়করণের ফলে সেখানে মার্কিন তেল কোস্পানিগুলোর লুটপাটের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এটাই মূলত দেশটির উপর মার্কিন সরকারের বিরোধের উৎস।
এখানে উল্লেখ্য, বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুদ রয়েছে ভেজেুয়েলায়। তিনশ বিলিয়ন ব্যরলের বেশি অপরিশোধিত তেল মজুদ রয়েছে দেশটিতে। সৌদি আরবের তেলের মজুদের চেয়েও বেশি। যদিও ভেনেজিুয়েলার তেল অনেক ভারী হওয়ায় তা শোধন অনেক কষ্টসাধ্য। দেশটির অর্থনীতি পুরোপুরি তেল নির্ভর।
হুগো শাভেজের এই সংস্কার কর্মসূচির পর থেকে কারাকাসের উপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়তে থাকে। নানাভাবে দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করার ষঢ়যন্ত্র করতে থাকে।
সাবেক প্রেসিডেন্টস হুগো শেভেজের উত্তরসূরী হিসেবে ২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসেন নিকোলাস মাদুরো। ক্ষমতায় এসে তিনি হুগো শাভেজের নীতি অবলম্বন করেন। এ কারণে শুরু থেকে তাকে উৎখানে উঠেপড়ে লাগে যুক্তরাষ্ট্র।
২.
ট্রাম্পের এই দস্যুবৃত্তি অনেক দেশের জন্য আতঙ্কের বিষয় হয়ে থাকবে। যে কোন স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নেয়ার ক্ষেত্রে এটা নজির হয়ে থাকবে।
অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া ও চীন। তারা এই ঘটনার পর বসে থাকবে না। টিকে থাকতে হলে তাদেরকেও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে হবে। ইতিমধ্যে রাশিয়া জার্মানির প্রধানমন্ত্রীকে তুলে দেয়ার হুশিয়ারি দিয়েছে। ফলে ঘটনাটা কেবল আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। চীন রাশিয়া যদি কোন রকম ব্যবস্থা নেয় তার সরাসরি প্রভাব সকল ক্ষেত্রে পড়বে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক চাপ থেকে আমাদের দূরে থাকার যুযোগ নেই।
উল্টো দিক থেকে দেখলে এটাও সত্য যে, এই ঘটনায় মার্কিন চরিত্র উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। সব কিছুর শেষ আছে। মার্কিন মোড়লিপনার শেষ বোধ হয় বেশি দূরে নয়।
৩
বাংলাদেশে এখন তীব্র শীত। আবহাওয়াবিদরা তাপমাত্রা আরো কমার আশঙ্কা করছেন। বিগত ১৭ বছরের উপর দেশের উপর দিয়ে স্বৈশাসনের তাণ্ডব চলেছে। ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের পর সেই সরকারের উৎখাতের দেড় বছর পার হয়েছে। কিন্তু দেশের মানুষ ভোটাধিকার পায়নি।
ভোট পিছানো বা যাতে না হতে পারে সে জন্য নানামুখী তৎপরতা দেখা গেছে। তাই ভোট নিয়ে সংশয় মাঝে মাঝে দেখা গেছে। কেউ কেউ নির্বাচনের পরিবর্তে বিপ্লবী সরকারের পক্ষে, অনেকে আবার জাতীয় সরকারের পক্ষে।
দীর্ঘ সময় নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতি পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। কে যে প্লে করছে বলা মুশকিল। আমাদের মতো পশ্চাৎপদ ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশে যে কোন ষড়যন্ত্র সফল করা কঠিন নয়।
কেবল ইলেকশন গণতন্ত্র নয়। তবে গণতন্ত্রে উত্তোরণের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ভোট খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভোটের বেশি দেরি নেই। এখনো সন্দেহ দূর হচ্ছে না।
ভেনেজুয়েলা আমাদের থেকে অনেক দূরের দেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও দূরের দেশ। তবে বর্তমান গ্লোবাল দুনিয়ায় কোন ঘটনাই দূরের নয়।
নির্বাচনে সব ঠিক হয়ে যাবে না নয়। কিন্তু এই সময়টা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইলেকশনে হার জিত থাকবে, এখন সকল দেশপ্রেমিককে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, শক্ত হাতে ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হবে।
টিবিএফ/