ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং ও ভ্যাপসা গরমে জনজীবন চরম সংকটের মুখে পড়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি এবার খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও শারীরিক অসুস্থতার শিকার হচ্ছেন।
গত শুক্রবার রাতে প্রচণ্ড গরমে ডিউটিরত অবস্থায় সরাইল থানার তিন পুলিশ সদস্য হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়েন। ভুক্তভোগী সদস্যরা হলেন বাবুল হোসেন (৪৭), মেহেরাব হোসেন (২৮) ও সাদ্দাম হোসেন (২৮)। পরবর্তীতে তাঁদের উদ্ধার করে দ্রুত সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসা প্রদান করা হয়।
সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনজুর কাদের ভূঁইয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টার মধ্যে অসহনীয় তাপমাত্রায় ওই তিন সদস্য সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। বর্তমানে তাঁরা আশঙ্কামুক্ত। ওসি আরও জানান, থানায় পাঁচজন নারী সদস্যসহ মোট ৬৮ জন পুলিশ কর্মরত আছেন। ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে সৃষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সবাইকে সাবধানে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উপজেলাটি শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় থাকলেও বর্তমানে এর চিত্র ভিন্ন। সরাইলের ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে সদরসহ ৭টি ইউনিয়ন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) এবং বাকি অংশ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। শুধু বিউবোর অধীনেই এখানে ৫১ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিদিন গড়ে প্রতি এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে। সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল জব্বারের মতে, গভীর রাতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের ফলে শিশু ও শিক্ষার্থীরা ঘুমাতে না পেরে কান্নাকাটি ও চিৎকার করে। জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারছেন না তারা।
তীব্র গরমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীরা ঘরের ভেতরে স্থির হতে পারছে না বলে জানান অভিভাবকেরা। অনেক এলাকায় টানা দুই-তিন দিন বিদ্যুৎ না থাকার মতো অভিযোগও পাওয়া গেছে। প্রত্যন্ত শাহজাদাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে তা ফিরে পাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না। ফলে তাঁরা চরম অবহেলা ও কষ্টের শিকার হচ্ছেন।
বিরামহীন লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়ছে ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর। বারবার ভোল্টেজ ওঠা-নামা করায় নষ্ট হচ্ছে টিভি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। এমনকি সরকারি হাসপাতালেও এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন জানান, গত কয়েক দিনে মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে হাসপাতালের ১১টি বৈদ্যুতিক পাখা বিকল হয়ে গেছে। এতে রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানেও ব্যাঘাত ঘটছে।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে সরাইল বিউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আহমেদ জানান, উপজেলায় ৫১ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ১৮ মেগাওয়াট। তবে বর্তমানে গ্রিড থেকে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ১০ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় লোডশেডিং দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সরাইলবাসীর এই চরম ভোগান্তি সহসা কাটছে না।