ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাবে তেহরান। বুধবার বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সেনা উপস্থিতি রয়েছে—এমন প্রতিবেশী দেশগুলোকেও এই বার্তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই সতর্কতা এমন এক সময় এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পক্ষে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানে সাম্প্রতিক এই দমন-পীড়নে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৬০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, যা ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বড় গণবিক্ষোভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা তিনজন কূটনীতিক জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান মার্কিন ঘাঁটিগুলোর একটিতে কর্মরত কিছু মার্কিন সেনা ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে তারা বলেছেন, এখনো পর্যন্ত বড় ধরনের সেনা প্রত্যাহার বা পূর্ণাঙ্গ সরিয়ে নেওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, যেমনটি গত বছর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে দেখা গিয়েছিল।
ওই কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর আল উদেইদ বিমানঘাঁটি থেকে কিছু কর্মীকে সরে যেতে বলা হয়েছে। একজন কূটনীতিক এটিকে ‘আদেশভিত্তিক প্রত্যাহার’ নয়, বরং একটি ‘অবস্থানগত সতর্কতা পরিবর্তন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জবাবে ইরান যখন এই ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল, তার আগে যে ধরনের ব্যাপক সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল—এবার তেমন দৃশ্য দেখা যায়নি।
কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। একইভাবে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও রয়টার্সের মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
ইরানি কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এই অস্থিরতার জন্য দায়ী করে আসছে। তেহরানের দাবি, যাদের তারা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে, তারাই এই সহিংস বিক্ষোভের সঙ্গে জড়িত।
এদিকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে কয়েক দিন ধরেই ইরানে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে আসছেন, যদিও কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু বলেননি। মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেয়, তাহলে ‘খুব কঠোর পদক্ষেপ’ নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, ‘যদি তারা তাদের ঝুলিয়ে দেয়, তাহলে আপনারা কিছু দেখতে পাবেন।’ একই দিনে ট্রাম্প ইরানিদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নেয়—কারণ ‘সহায়তা আসছে’।
নাম প্রকাশ না করা ওই ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, তেহরান ইতোমধ্যে আঞ্চলিক দেশগুলোর কাছে অনুরোধ জানিয়েছে, তারা যেন ‘ওয়াশিংটনকে ইরানের ওপর হামলা চালানো থেকে বিরত রাখে’। তিনি বলেন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—এই দেশগুলোর মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ–এর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ আপাতত বন্ধ রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে রয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের ফরোয়ার্ড সদর দপ্তর এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর।
ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাপকভাবে বন্ধ থাকায় ইরানের ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৪০৩ জন বিক্ষোভকারী এবং সরকারপন্থী ১৪৭ জন ব্যক্তির মৃত্যুর তথ্য যাচাই করতে পেরেছে। ইরানি এক কর্মকর্তা মঙ্গলবার রয়টার্সকে বলেন, নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল ব্যারো বলেছেন, তার ধারণা অনুযায়ী এটি ইরানের সমসাময়িক ইতিহাসের ‘সবচেয়ে সহিংস দমন অভিযান’, যা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।
একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানি সরকারের তাৎক্ষণিক পতনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না এবং নিরাপত্তা বাহিনী এখনো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। যদিও ব্যাপক দমন-পীড়নের মাধ্যমে কিছুটা শান্তি ফিরেছে, তবু সরকার এই অস্থিরতায় গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে ইসরায়েলের এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু–র নিরাপত্তা মন্ত্রিসভাকে ইরানে সরকার পতনের সম্ভাবনা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে অবহিত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত বছর ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনব্যাপী সরাসরি যুদ্ধ হয়েছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তেহরান, ইসফাহান, বুশেহরসহ বিভিন্ন শহরে নিহতদের জানাজায় বিশাল শোকমিছিলের দৃশ্য প্রচার করা হয়েছে। এসব মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের হাতে জাতীয় পতাকা, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি–র ছবি এবং দাঙ্গাবিরোধী স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। একই সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন। আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ–র সঙ্গে আলাপে আরাঘচি বলেন, দেশে ‘শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে’ এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ইরানিরা তাদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
অন্যদিকে তেহরানের একটি কারাগার পরিদর্শন করে ইরানের প্রধান বিচারপতি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে মানুষ হত্যার অভিযোগ রয়েছে—বিশেষ করে যারা ‘শিরচ্ছেদ বা আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে’—তাদের দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। এইচআরএএনএর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৮ হাজার ১৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইরানি কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাও জানিয়েছে, কারাজ শহরে বিক্ষোভের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে গ্রেপ্তার ২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ছিল বুধবার। তবে সেটি কার্যকর হয়েছে কি না—তা তারা নিশ্চিত করতে পারেনি। রয়টার্সও এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, আগেও ইরান একাধিক বিক্ষোভ সামাল দিতে সক্ষম হলেও, এবারের অস্থিরতা এমন এক সময় চলছে, যখন দেশটি গত বছরের যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে লেবাননের হিজবুল্লাহসহ আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বল হয়ে পড়ায় তেহরানের আঞ্চলিক অবস্থানও চাপে রয়েছে।
এর মধ্যেই ট্রাম্প সোমবার ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা যেকোনো দেশের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করা হবে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর মার্কিন নাগরিকদের ‘অবিলম্বে ইরান ত্যাগের’ আহ্বান জানায়।