প্রায় দুই দশকের আলোচনা শেষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ভারত একটি ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে সই করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির প্রেক্ষাপটে পণ্য বাজারে বৈচিত্র্য আনার কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে এই চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন এবং ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডের স্পিগেল জানিয়েছে, বাণিজ্যিক বাধা ও শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে ইইউ ও ভারতের মধ্যে পণ্য ও পরিষেবা বিনিময় বাড়ানোই এই চুক্তির মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক শুল্কনীতি এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চুক্তি সইয়ের পর উরসুলা ভন ডার লেন বলেন, “আজ ইউরোপ ও ভারত ইতিহাস তৈরি করেছে। এটি আমাদের করা সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলোর একটি।” ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেন।
ইইউ কমিশনের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি হচ্ছে, যা উভয় পক্ষের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করবে যে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখনো কার্যকর ফল দিতে পারে।
এই চুক্তি দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে ইইউর করা মেরকোসুর চুক্তির মতো এতটা বিস্তৃত না হলেও ভারতের বিশাল বাজারের কারণে এটিকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বাণিজ্য চুক্তিগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১৪৬ কোটি, যা চীনের ১৪০ কোটিকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সর্বাধিক। অন্যদিকে, ইইউতে বসবাস করে প্রায় ৪৫ কোটি মানুষ। ভারত ও ইইউ সম্মিলিতভাবে বিশ্বের মোট জিডিপি ও জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
ইইউর তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তি থেকে জার্মান গাড়িশিল্প বিশেষভাবে উপকৃত হতে পারে। বর্তমানে ইইউ থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর ভারত সর্বোচ্চ ১১০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে। নতুন চুক্তির আওতায় বছরে আড়াই লাখ গাড়ির ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে এই শুল্ক ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি যন্ত্রপাতির ওপর ৪৪ শতাংশ, রাসায়নিক পণ্যের ওপর ২২ শতাংশ এবং ওষুধের ওপর ১১ শতাংশ শুল্কের বড় অংশ বাতিল করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর শুল্কনীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় ভারতের সঙ্গে ইইউর এই চুক্তিকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইইউ জানায়, বর্তমানে ভারতে ছয় হাজারের বেশি ইউরোপীয় কোম্পানি কার্যক্রম চালাচ্ছে। চুক্তির ফলে ২০৩২ সালের মধ্যে ভারতে ইইউর রপ্তানি দ্বিগুণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ, ইইউ থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশের ওপর আরোপিত শুল্ক বাতিল বা কমানো হবে। এতে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ইউরো (প্রায় ৫৮ হাজার ২৮ কোটি টাকা) শুল্ক সাশ্রয় হবে।
তবে ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারের সম্ভাবনা এখনো সীমিত। ভারতের ভোক্তামনস্ক মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রায় ১৫ কোটি হলেও দেশটিতে সম্পদ ও ক্রয়ক্ষমতার বড় বৈষম্য রয়ে গেছে।
চুক্তিটি কার্যকর হতে সময় লাগবে। কারণ, পূর্ণ আইনি যাচাই, ইইউর সব দাপ্তরিক ভাষায় অনুবাদ এবং সদস্যরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন।
এর আগে ২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইইউ ও ভারতের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা হলেও তা ব্যর্থ হয়। ২০২২ সালে আবার আলোচনা শুরু হয় এবং ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির প্রেক্ষাপটে উভয় পক্ষ এতে নতুন করে আগ্রহ দেখায়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করছে, যার মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের কারণে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ রয়েছে। বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ভারত মস্কো ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে তেল ও গ্যাসের বড় অংশ রাশিয়া থেকে আমদানি করছে।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে কৃষি খাতকে সবচেয়ে সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ইইউ কমিশন জানিয়েছে, ইউরোপীয় কৃষকদের জন্য সংবেদনশীল পণ্য—গরুর মাংস, হাঁস-মুরগির মাংস, চাল ও চিনি—এই চুক্তির আওতায় উদারীকরণ থেকে বাদ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ভারতীয় কৃষিপণ্যকে ইইউর কঠোর স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।