সারাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি জানান, নির্বাচনী নিরাপত্তায় বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করবে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা–সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভা শেষে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে দেশজুড়ে দুই ধাপে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হবে। ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা, মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সসহ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার অধীনে সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে। এ বিষয়ে গত ৬ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে।
তিনি জানান, ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ডসহ বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দিতে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও মোতায়েন থাকবেন। প্রথম ধাপের মোতায়েন কার্যক্রম বহাল থাকবে এবং দ্বিতীয় ধাপে ভোটকেন্দ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করা হবে, যা ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাত দিন চলবে।
নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় পুলিশ, আনসার ও ভিডিপির পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও র্যাবের সমন্বয়ে একটি আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল গঠন করা হবে। এই সেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বাহিনীর একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯–এ একটি বিশেষ টিম গঠন করা হবে, যা আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। নির্বাচনসংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ বা তথ্য দ্রুত সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় কেন্দ্রভেদে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার, বিশেষ অভিযান ও তল্লাশিচৌকি পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আইনশৃঙ্খলার অবনতি বা নির্বাচন বানচালের যেকোনো অপতৎপরতা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১ লাখ, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমান বাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন, পুলিশের ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩ জন, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪ জন, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন, কোস্টগার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫ জন, র্যাবের ৭ হাজার ৭০০ জন এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ১৩ হাজার ৩৯০ জন সদস্য।
দেশজুড়ে মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৪২ হাজার ৭৬১টি। এর মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ৮ হাজার ৭৮০টি, গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ১৬ হাজার ৫৪৮টি এবং সাধারণ কেন্দ্র ১৭ হাজার ৪৩৩টি। অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে পুলিশের মাধ্যমে ২৫ হাজার বডি ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপনের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, বিভিন্ন বাহিনীর নির্বাচনি প্রশিক্ষণ আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে শেষ হবে। নির্বাচন উপলক্ষে এই প্রথম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য আলাদা প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ড্রোন ব্যবহারের ব্যাপকতা। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড, র্যাব ও আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনী সমন্বিতভাবে মোট চার শতাধিক ড্রোন ব্যবহার করবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডগ স্কোয়াডও মোতায়েন থাকবে।
নির্বাচনী নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় নতুন সংযোজন হিসেবে ব্যবহার করা হবে ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ–২০২৬’। এই অ্যাপটি ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) তৈরি করেছে। অ্যাপটির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম সংযুক্ত থাকবে, যা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত প্রতিকারে সহায়তা করবে।