নির্ধারিত সময়ের তিন সপ্তাহ আগেই প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস–এর কাছে প্রতিবেদন পেশ করেছে নবম জাতীয় বেতন কমিশন। বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে ২৩ সদস্যের এই কমিশন কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান–এর নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা–তে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
সরকার গত বছরের ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে। ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের পর ১২ বছর পর এই কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের প্রতিবেদন দাখিলের শেষ তারিখ ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। কমিশন নির্ধারিত বাজেটের মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে।
প্রতিবেদন গ্রহণের সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এটি একটি বড় কাজ এবং মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এর অপেক্ষায় ছিল। উপস্থাপিত আউটলাইন দেখে কাজটিকে সৃজনশীল বলে উল্লেখ করা হয়।
এ সময় কমিশনপ্রধান জানান, গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে বড় পরিবর্তন এসেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সময়োপযোগী বেতন কাঠামো না থাকায় সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে নির্ধারিত কার্যপরিধি অনুযায়ী বিদ্যমান বেতন, ভাতা ও সুবিধাদি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়েছে।
কমিশন নির্ধারিত কার্যপরিধি অনুসরণ করে অনলাইন ও অফলাইনে ১৮৪টি সভা করেছে এবং ২ হাজার ৫৫২ জনের মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন সমিতি ও অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করা হয়। প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থান ও বাস্তবায়নযোগ্যতাও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
কমিশনপ্রধান জানান, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে আনুমানিক ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিবেদন দাখিলের সময় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, পরবর্তী ধাপে প্রস্তাব বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। এ জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে, যা বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে।
কমিশন সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি স্কেলে বেতন সুপারিশ করেছে। সর্বনিম্ন বেতন স্কেল ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও রয়েছে স্বাস্থ্যবীমা চালু, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, ভাতাসমূহ পর্যালোচনায় আলাদা কমিটি গঠন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে মানবসম্পদ উন্নয়নের সুপারিশ।
এ ছাড়া কোনো কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, সর্বোচ্চ দুই সন্তান পর্যন্ত। টিফিন ভাতার বিদ্যমান বিধান বহাল রেখে ভাতার হার বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মাসিক টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন পেশের সময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদারসহ কমিশনের পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন সদস্যরা।