দৌলতদিয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির বারান্দায় এখন সারি সারি ব্যাগের স্তূপ। কোনো ব্যাগে স্বজনের ছবি, কোনোটিতে তসবিহ, আবার কোনোটিতে পরম মমতায় গ্রাম থেকে আনা সতেজ সবজি। স্তূপের ওপর পড়ে আছে একটি লাল-কালো নতুন খেলনা বন্দুক। হয়তো কোনো শিশু বায়না ধরে মেলা থেকে এটি কিনেছিল। সেই ছোট্ট হাতটি এখন আর নেই, কিন্তু তার স্মৃতি হয়ে বন্দুকটি পড়ে আছে নিথরভাবে।
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী বাস পড়ে যাওয়ার বিয়োগান্তক ঘটনার পর এখন কেবল স্বজনদের আহাজারি আর পড়ে থাকা স্মৃতিগুলোর দীর্ঘশ্বাস ভারী করছে বাতাস।
গত বুধবার বিকেলে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকাগামী ‘সৌহার্দ্য’ পরিবহনের একটি বাস দৌলতদিয়া ৩ নম্বর পন্টুন দিয়ে নদীতে পড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর দীর্ঘ অভিযানের পর বাসটি উদ্ধার করা হলেও এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন। নিহতদের মধ্যে ৮ জন পুরুষ, ১১ জন নারী এবং ৭ জন শিশু রয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যাগ ও জুতাগুলো এখন পুলিশের হেফাজতে রয়েছে, যা দেখে শনাক্ত করছেন বেঁচে ফেরা যাত্রী বা নিহতদের স্বজনরা।
স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন স্বজনরা: বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত মাত্র তিনজনকে তাদের ব্যাগ বুঝিয়ে দিয়েছে পুলিশ। অধিকাংশ ব্যাগই এখনো দাবিহীন পড়ে আছে। যার মধ্যে অর্ধেকই মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ। এখনো কোনো নারী এই ব্যাগগুলো নিতে আসেননি। ব্যাগ নিতে আসা তাসলিমা আক্তার জানান, তার ভাই বাসটি পানিতে পড়ার দুই মিনিট আগে নেমে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে গেছেন। ব্যাগের ভেতরে থাকা ভাইয়ের ছবি ও তসবিহ দেখে তিনি সেটি শনাক্ত করেন। আরেক যাত্রী আবুল কালাম জানান, বাসে তার জরুরি সার্টিফিকেট ও টাকা ছিল, যা ভিজে গেলেও শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করতে পেরেছেন।
দুর্ঘটনার বিবরণ: ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, বুধবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে বাসটি প্রায় ৬০ ফুট গভীর পানিতে তলিয়ে যায়। রাত ১২টা ৩৮ মিনিটে বাসটি পানি থেকে তোলা সম্ভব হয়। বাসে আনুমানিক ৪০ জন যাত্রী ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১১ জন যাত্রী সাঁতরে পাড়ে উঠতে পারলেও বাকিরা আটকা পড়েন। উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয়দের সহায়তায় ৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও হাসপাতালে নেওয়ার পর দুই নারীকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন জানান, বাসের ভেতরে অনেক যাত্রী ছিল। এখন পর্যন্ত মাত্র ৩টি ব্যাগ হস্তান্তরের ঘটনা প্রমাণ করে যে, বাকি ব্যাগগুলোর মালিকরা হয়তো দাফন-কাফন নিয়ে ব্যস্ত কিংবা তারা আর বেঁচে নেই। পন্টুনে পড়ে থাকা একটি নিঃসঙ্গ কেডস বা কাদা মাখা ব্যাগগুলো এখন কেবলই এক একটি সলিল সমাধির গল্প বলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, যথাযথ প্রমাণ সাপেক্ষে উদ্ধার হওয়া মালামাল প্রকৃত মালিক বা তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। তবে সেই খেলনা বন্দুকটির মালিক শিশুটির মতো আরও অনেকের ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘাটের বাতাসে এখন কেবলই শোকের মাতম।