ইরানজুড়ে চলমান বিক্ষোভ বর্তমানে সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি বিক্ষোভকে সহিংস ও রক্তাক্ত করে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) তেহরানে বৈদেশিক কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে আব্বাস আরাঘচি বলেন, গত সপ্তাহান্তে সহিংসতা বাড়লেও এখন পরিস্থিতি ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে ইরানের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে চাইছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি বিক্ষোভকারীদের মধ্যে থাকা ‘সন্ত্রাসীদের’ আরও উসকে দিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সহিংসতা বাড়িয়ে ইরানের ভেতরে বিদেশি হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র তৈরি করা। তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, সংলাপের জন্যও প্রস্তুত।’
আরাঘচির দাবি, বিক্ষোভ চলাকালে অস্ত্র বিতরণের ভিডিওপ্রমাণ সরকারের হাতে এসেছে। আটক ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তিও শিগগিরই প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীকে সহিংসতায় জড়িতদের ‘খুঁজে বের করার’ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
চার দিন ধরে চলা দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে আরাঘচি জানান, পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে খুব শিগগিরই ইন্টারনেট সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হবে। দূতাবাস ও সরকারি দপ্তরেও ধাপে ধাপে সংযোগ চালু করা হবে বলে জানান তিনি।
এর মধ্যেই রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটন ‘খুব কঠোর কিছু বিকল্প’ বিবেচনা করছে, যার মধ্যে সামরিক পদক্ষেপও থাকতে পারে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি খুব গুরুত্ব সহকারে দেখছি। সামরিক বাহিনীও দেখছে। খুব শক্ত কিছু সিদ্ধান্ত সামনে আছে।’
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানি সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের ক্বালিবাফ সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরাইলি হামলা ও ১২ দিনের যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কোনো ভুল করলে ইসরায়েলসহ ওয়াশিংটনের সব ঘাঁটি বৈধ হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে।’
একই সময়ে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সামাজিক মাধ্যমে ইঙ্গিতপূর্ণ প্রতিক্রিয়ায় লেখেন, ‘অহংকারী শাসকরা— ফিরাউন, নমরুদ, রেজা শাহ যেভাবে পতন হয়েছে, সেই একই পরিণতি অহংকারী ট্রাম্পকেও দেখতে হবে।’
সরকারি হিসাবে, টানা তিন সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভে নিহতদের ‘শহিদ’ ঘোষণা করে তিন দিনের জাতীয় শোক পালন করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, এ পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ১০৯ সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর সংখ্যা সরকারিভাবে জানানো হয়নি। প্রবাসী ইরানি কর্মীদের দাবি, নিহতের সংখ্যা কয়েকশ।
দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সামাজিক মাধ্যমে বিক্ষোভের ছবি ও ভিডিও তুলনামূলকভাবে কম দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ জানিয়েছে, তেহরানের নাভাব ও সাদাত আবাদসহ চাহারমাহাল ও বাখতিয়ারি এবং রাযাভি খোরাসানের কয়েকটি শহরে বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ইরান হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে, যে পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয়। হাজার বছরের ইতিহাস ও বৈচিত্র্যময় জাতিগত কাঠামোর এই দেশে চলমান বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।