ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযানের প্রেক্ষাপটে দেশটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্ধারিত সব বৈঠক বাতিল করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরানি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে সরাসরি বার্তা দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সহায়তা আসছে’। ট্রাম্পের এই বক্তব্য নতুন করে আঞ্চলিক সংঘাত ও যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মঙ্গলবার ট্রাম্প নিজেই জানান, ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘নির্বিচার দমন-পীড়ন’ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের বৈঠক বাতিল করেছেন। ইরানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের বরাতে বলা হয়েছে, তিনি ইরানের জনগণের উদ্দেশে ‘সহায়তা আসছে’ বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরানের দেশপ্রেমিকরা, বিক্ষোভ চালিয়ে যান—আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নিন। হত্যাকারী ও নির্যাতনকারীদের নাম সংরক্ষণ করুন। তাদের বড় মূল্য দিতে হবে।’ একই পোস্টে তিনি আরও বলেন, ‘বিক্ষোভকারীদের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব বৈঠক বাতিল করেছি। সহায়তা আসছে। এমআইজিএ (মেক ইরান গ্রেট এগেইন)!!!’
ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য আহ্বানের পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন কড়া ভাষা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
এদিকে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক ইরানি সরকারি কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে ইরানে চলমান বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। দেশব্যাপী অস্থিরতা দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পর এই প্রথম এত বড় সংখ্যক মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ বলে উল্লেখ করেছে রয়টার্স।
ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড দরপতন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা কারাজ, ইসফাহান, শিরাজ, কেরমানশাহসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই আন্দোলনে যুক্ত হন।
ইরানি কর্তৃপক্ষ চলমান অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করে আসছে এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। এর ফলে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ বাড়ছে, যা হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, মঙ্গলবার এক ইরানি কর্মকর্তা দাবি করেছেন, নিহতদের মধ্যে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য—উভয়ই রয়েছেন এবং এই মৃত্যুর জন্য ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী। তবে কতজন সাধারণ মানুষ আর কতজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি তিনি।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছিল, নিহতের সংখ্যা ৬৪৬। সংস্থাটির তথ্যমতে, নিহতদের মধ্যে ৫০৫ জন বিক্ষোভকারী ও নয়জন শিশু রয়েছে। তারা আরও জানায়, ইরানের ৩১টি প্রদেশের ১৮৭টি শহরের ৬০৬টি স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে এবং এসব ঘটনায় অন্তত ১০ হাজার ৭২১ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো হতাহতের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি।