ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন আরও হাজার হাজার মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ-এর তথ্যের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স শনিবার এ খবর জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা আট দিন বন্ধ থাকার পর দেশটিতে ইন্টারনেট ব্যবহারে সামান্য উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। ধীরে ধীরে জনজীবন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে এবং নতুন করে দেশের কোনো প্রান্তে বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি।
এইচআরএএনএ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও সহিংসতায় মোট ৩ হাজার ৯০ জনের প্রাণহানির তথ্য তারা যাচাই-বাছাই করেছে। নিহতদের মধ্যে ২ হাজার ৮৮৫ জনই বিক্ষোভকারী।
দেশটির নাগরিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কঠোর দমন-পীড়নের কারণে বিক্ষোভ বর্তমানে অনেকটাই স্তিমিত। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারী গ্রেপ্তারের খবর প্রচার করা হয়েছে।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, রাজধানী তেহরান টানা চার দিন ধরে তুলনামূলক শান্ত রয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, শহরের আকাশে ড্রোন উড়তে দেখা গেছে। তবে বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার বড় ধরনের কোনো বিক্ষোভের লক্ষণ দেখা যায়নি।
ক্যাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী উত্তরাঞ্চলের একটি শহরের বাসিন্দারাও জানিয়েছেন, সেখানকার রাস্তাঘাট শান্ত রয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটের জেরে গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। পরবর্তীতে তা ইসলামি প্রজাতন্ত্রে ধর্মীয় শাসনের অবসান দাবিতে ব্যাপক আন্দোলনে রূপ নেয়। গত সপ্তাহের শেষ দিকে ব্যাপক সহিংসতার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়। দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও এক ইরানি কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা; এতে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছে, প্রায় ২০০ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর শনিবার সকালে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগে সামান্য উন্নতি দেখা গেছে। তবে সংযোগের মাত্রা স্বাভাবিকের মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে।
বিদেশে বসবাসরত কয়েকজন ইরানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, শনিবার ভোরের দিকে তারা ইরানে থাকা ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সীমিত পরিসরে বার্তা আদান-প্রদান করতে পেরেছেন।
এর আগে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, তেহরানের নেতারা গণহারে ফাঁসি কার্যকরের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন।
ট্রুথ সোশালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা জানাই যে, গতকাল (৮০০ জনেরও বেশি) নির্ধারিত সব ফাঁসি ইরানের নেতৃত্ব বাতিল করেছে। ধন্যবাদ!’
তবে ইরান কর্তৃপক্ষ এ ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেনি কিংবা সেগুলো বাতিল করা হয়েছে বলেও নিশ্চিত করেনি।
এদিকে ইরান থেকে ফেরা ভারতীয় শিক্ষার্থী ও তীর্থযাত্রীরা জানিয়েছেন, দেশটিতে অবস্থানকালে তারা নিজ নিজ আবাসস্থলে আটকা ছিলেন এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি।
তেহরানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের মেডিকেল শিক্ষার্থী জেড সাইদা বলেন, ‘আমরা কেবল সহিংস বিক্ষোভের গল্পই শুনেছি। একবার এক ব্যক্তি জ্বলন্ত লাঠি হাতে আমাদের গাড়ির সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্থানীয় ভাষায় কিছু একটা চিৎকার করছিল, তার চোখেমুখে ছিল তীব্র ক্ষোভ।’
শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু রয়েছে এবং ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে নয়াদিল্লি।
সূত্র: রয়টার্স