ইরানের সাথে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি যদি কোনো কারণে ভেস্তে যায়, তবে দেশটির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির সামরিক সক্ষমতা চিরতরে ধ্বংস করে দিতে বড় ধরনের হামলার ছক কষছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। মূলত বিশ্ব অর্থনীতির ধমনী হিসেবে পরিচিত এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন এবার ইরানের ‘ডায়নামিক টার্গেট’ বা চলন্ত সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোকে প্রধান নিশানায় পরিণত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
বিশেষ করে ইরানের ছোট ও দ্রুতগামী আক্রমণকারী নৌযান এবং মাইন স্থাপনকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে এই ব্যাপক অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যা ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল তেহরান। গত ৭ এপ্রিল শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির মধ্যেও এই জলপথটি কার্যত অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনেই মার্কিন প্রশাসন এমন কঠোর সামরিক পরিকল্পনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের নীতিগত পর্যালোচনায় থাকা এই নতুন পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো দক্ষিণ আরব উপসাগর ও ওমান উপসাগর সংলগ্ন এলাকায় ইরানের সামরিক অবকাঠামো সমূলে উৎপাটন করা। এর আগে পরিচালিত বিমান হামলাগুলো মূলত ইরানের মূল ভূখণ্ডের ভেতরের লক্ষ্যবস্তুগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এবার নজর দেওয়া হচ্ছে জলপথ সংলগ্ন উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর। ওয়াশিংটন মনে করছে, হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন এলাকায় ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র এবং অসংখ্য ছোট নৌযান এখনো অক্ষত রয়েছে, যা যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন কৌশলে আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় বোমাবর্ষণের কথা ভাবা হচ্ছে। যদিও জ্যেষ্ঠ শিপিং ব্রোকার এবং সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ সতর্ক করেছেন যে, কেবল এই জলপথের আশেপাশে হামলা চালিয়েই দ্রুত জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব নাও হতে পারে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখলেও যুদ্ধের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, যদি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত কোনো সুরাহা না হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় পূর্ণোদ্যমে সামরিক অভিযান শুরু করবে। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি কমানোর যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন, এই জলপথ অবরুদ্ধ থাকা সেই প্রচেষ্টাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ফলে মার্কিন বাহিনী এখন অনেক বেশি আক্রমণাত্মক মেজাজে রয়েছে। তবে সাবেক ও বর্তমান অনেক কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, নতুন করে এই আক্রমণ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের কর্মকর্তারা সরাসরি কোনো ভবিষ্যৎ অভিযানের কথা স্বীকার না করলেও তারা জানিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্টের সামনে সব ধরনের সামরিক বিকল্প খোলা রাখা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, আগের দফায় মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি পুরোপুরি নিঃশেষ হয়নি। দেশটির প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার এবং হাজার হাজার ড্রোন এখনো ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় এই অবশিষ্ট লঞ্চার, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে একেবারে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ওয়াশিংটন মনে করছে, ইরান এই যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে তাদের অনেক সামরিক সম্পদ গোপন ও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে, যা আগামীতে বড় মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের এই কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি যথাযথভাবে চুক্তির শর্ত পালন না করে, তবে তাদের নতুন সামরিক অবস্থানগুলোতেও হামলা চালানো হবে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়ানোর চেয়ে কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, তবে তিনি এই যুদ্ধবিরতির সময়সীমা অনির্দিষ্টকালের জন্য দীর্ঘায়িত করতে রাজি নন। পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, হোয়াইট হাউস থেকে সবুজ সংকেত পাওয়া মাত্রই মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালি ও ইরানের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় পুনরায় হামলা চালানোর জন্য শতভাগ প্রস্তুত রয়েছে। তেহরানের সামরিক আধিপত্য খর্ব করে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও বাণিজ্যিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য।