মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জাহাজ জব্দের পাল্টাপাল্টি ঘটনায় আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় এক ভয়াবহ অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দুটি বিশাল বাণিজ্যিক কার্গো জাহাজ নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার পর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও ৩৮ লাখ ব্যারেল ইরানি তেলসহ দুটি ট্যাংকার জব্দের দাবি করেছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই মুখোমুখি অবস্থানকে বিশ্লেষকরা ‘জাহাজ যুদ্ধের’ এক নতুন ও বিপজ্জনক পর্যায় হিসেবে দেখছেন, যা বিশ্ব অর্থনীতির সরবরাহ চেইনকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ইরানের হাতে ওমান সাগর থেকে জব্দ হওয়া জাহাজ দুটির মধ্যে একটি হলো গ্রিক মালিকানাধীন ও লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘এপামিনন্ডাস’, যা ২১ জন ক্রু নিয়ে ভারতের একটি বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। অন্যটি পানামার পতাকাবাহী ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’, যার মালিক বিশ্বের বৃহত্তম শিপিং কোম্পানি এমএসসি। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার জানিয়েছে যে, জাহাজ দুটির নাবিকরা এখন পর্যন্ত নিরাপদ আছেন। তবে তেহরানের সঙ্গে এই ক্রুদের মুক্তি নিয়ে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সমাধান আসেনি। মূলত আন্তর্জাতিক এই জলপথে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতেই ইরান এমন মারমুখী অবস্থান নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের এই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে গিয়ে ৩৮ লাখ ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেলসহ দুটি ট্যাংকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনিন পিরো আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, জব্দ করা তেলের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানি তেল বিক্রির বিশেষ ছাড় বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং যেকোনো দেশ বা কোম্পানি ইরান থেকে তেল কিনলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গ্রেট প্রেশার’ কৌশলের অংশ হিসেবেই ওয়াশিংটন এই মুহূূর্তে তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জব্দ করা এই বিপুল পরিমাণ ইরানি তেল শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টন বন্দরে খালাস করে বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে, যেমনটি গত ডিসেম্বরে ভেনেজুয়েলার তেলের ক্ষেত্রে করা হয়েছিল। এই পাল্টাপাল্টি জব্দের রাজনীতি কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়ে। পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগর এলাকায় অস্থিরতা বাড়ায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর বিমা খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে পণ্য পৌঁছাতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিতে পারে, যা বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য একটি বড় বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করছেন।