গাছের ক্ষতি রোধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিল রাষ্ট্র। পেরেক লাগানো বা কোনো ধাতব বস্তু ব্যবহার করে গাছের ক্ষতিসাধন করলে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রেখে ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছেন রাষ্ট্রপতি। বনভূমি সংরক্ষণ, বৃক্ষ কর্তন নিয়ন্ত্রণ এবং জরিপ–রেকর্ড হালনাগাদে এই অধ্যাদেশে একাধিক নতুন ও স্পষ্ট বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে অধ্যাদেশটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক উৎপাদন ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পেরেক বা ধাতব বস্তু দিয়ে গাছের ক্ষতিসাধন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ বিধান অমান্য করলে আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করতে পারবেন।
অধ্যাদেশে কর্তন নিষিদ্ধ বৃক্ষের বিষয়ে আরও কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। গেজেটভুক্ত কর্তন নিষিদ্ধ বা বন অধিদপ্তর কর্তৃক বিপদাপন্ন ঘোষিত কোনো গাছ কাটলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করা যাবে। পাশাপাশি ক্ষতিপূরণমূলক বনায়নের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে আদালতের হাতে। অনুমতি সাপেক্ষে কর্তনযোগ্য বৃক্ষের বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন অধ্যাদেশে বনভূমির জরিপ ও রেকর্ড সংক্রান্ত বিষয়েও বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বৃক্ষাচ্ছাদন থাকুক বা না থাকুক, গেজেট দ্বারা ঘোষিত সব বনভূমি বন বিভাগের নামে রেকর্ডভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। রক্ষিত ও অর্জিত বনভূমি জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ড থাকবে এবং এসব বনভূমির ব্যবস্থাপনা করবে বন বিভাগ। বন বিভাগের ব্যবস্থাপনাধীন কোনো রক্ষিত বা অর্জিত বনভূমি বন্দোবস্ত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি।
তবে বিধি অনুযায়ী কোনো বনভূমি অবমুক্ত করা হলে এসব রেকর্ড সংক্রান্ত বিধান প্রযোজ্য হবে না। অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বনভূমির জরিপ, সীমানা নির্ধারণ ও রেকর্ড হালনাগাদে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃক্ষ কর্তনের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে। বন সংরক্ষণ কর্মকর্তার পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে ‘বন আইন, ১৯২৭’-এর আওতাভুক্ত গেজেটভুক্ত বন, অশ্রেণিভুক্ত রাষ্ট্রীয় বন, সামাজিক বন, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণপরিসরের গাছ কর্তন বা অপসারণ করা যাবে। এ অধ্যাদেশ বাস্তবায়নে প্রধান বন সংরক্ষক বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে বৃক্ষ সংরক্ষণ কর্মকর্তার দায়িত্ব দেবেন।
তবে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির অনুমতি সাপেক্ষে কর্তনযোগ্য তালিকাভুক্ত গাছ নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে কর্তন করা যাবে। এ ক্ষেত্রে গাছের প্রজাতি, সংখ্যা, উচ্চতা, বুক সমান উচ্চতায় বেড় ও কর্তনের কারণ উল্লেখ করে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। আবেদন যাচাই ও সরেজমিন পরিদর্শনের পর ৩০ দিনের মধ্যে লিখিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে ১৫ দিনের মধ্যে বন সংরক্ষকের কাছে আপিল করা যাবে।
রোগাক্রান্ত বা মৃত গাছ, ঝড়ে পড়া গাছ, সড়ক যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা বৃক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা জীবন ও সম্পদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ গাছ কাটতে আগাম অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না। একই সঙ্গে কর্তন নিষিদ্ধ ও অনুমতি সাপেক্ষে কর্তনযোগ্য তালিকার বাইরে থাকা কিছু বাণিজ্যিক বা গ্রামীণ ব্যবহৃত বৃক্ষের ক্ষেত্রেও অনুমোদন ছাড়াই কর্তনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মৌজা রিজার্ভে গাছ কাটার ক্ষেত্রে এই অধ্যাদেশের পরিবর্তে ‘চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাকস রেগুলেশন, ১৯৯০’-এর বিধান প্রযোজ্য হবে। তবে অনুমোদন দিয়ে গাছ কাটলে একই এলাকায় নির্দিষ্ট প্রজাতি ও সংখ্যার বৃক্ষরোপণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অধ্যাদেশে বনভূমি বিনিময়ের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থা বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন জমির ভেতরে এক একরের কম বিচ্ছিন্ন বনভূমি থাকলে জনস্বার্থ বিবেচনায় সরকারপ্রধানের অনুমোদনে বিনিময়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বন সংলগ্ন দ্বিগুণ নিষ্কণ্টক জমি বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, যা সরকার সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা করবে।
আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক, কর্মকর্তা বা প্রতিনিধিকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা জরিমানার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ফরেস্ট অফিসারদের মামলা দায়ের, তদন্ত, তল্লাশি, জব্দ ও আদালতে মামলা পরিচালনার এখতিয়ার নির্ধারণ করা হয়েছে।
অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার তিন মাসের মধ্যে কর্তন নিষিদ্ধ ও অনুমতি সাপেক্ষে কর্তনযোগ্য বৃক্ষের তালিকা গেজেটে প্রকাশ এবং প্রয়োজনে হালনাগাদের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। বন অধিদপ্তরকে গাছে পেরেক বা ধাতব বস্তু ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।