জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে যুক্ত বাম ও মধ্যপন্থী মতাদর্শের তরুণদের উদ্যোগে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ) আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্মটির তিন মুখপাত্র ও ১০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঘোষণা করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এনপিএর আত্মপ্রকাশ হয়। সেখানে কাউন্সিল সদস্য মীর হুযাইফা আল মামদূহ মুখপাত্র ও কাউন্সিল সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন।
ঘোষিত তিন মুখপাত্র হলেন লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট ফেরদৌস আরা রুমী, মঈনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান) এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী নাজিফা জান্নাত।
কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে থাকা ১০১ সদস্যের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগকারী চার নেতাও রয়েছেন। তাঁরা হলেন এনসিপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায়, সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব তুহিন খান, সাবেক কালচারাল সেলের উপপ্রধান সৈয়দা নীলিমা দোলা এবং সাবেক সদস্য সৈয়দ ইমতিয়াজ নদভী। এ ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অলিউর সান, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি বাকী বিল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বর্তমান সভাপতি মেঘমল্লার বসু ও সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সহসমন্বয়ক নূমান আহমাদ চৌধুরী ও রাফসান আহমেদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের প্রতিনিধিরা কাউন্সিলে স্থান পেয়েছেন।

মুখপাত্র ও কাউন্সিল সদস্যদের নাম ঘোষণার পর এনপিএর তিন মুখপাত্র প্ল্যাটফর্মটির ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। সেখানে এনপিএর পাঁচটি মূলনীতি তুলে ধরা হয়—গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষা।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। এটি কেবল শাসক পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না; বরং ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিসরের যে স্বপ্ন তখন তৈরি হয়েছিল, দেড় বছর পর বাস্তবতা তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে বলেও ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ভাষা ও চর্চার পুনরুত্থান ঘটছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি সংখ্যালঘুর কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করার গণতান্ত্রিক ধারণা গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। ধর্মীয়, জাতিগত ও লৈঙ্গিক সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই জুলাইয়ের অভ্যুত্থান হলেও প্রাণাধিকার ও মানবাধিকার এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।
ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা এবং উগ্র গোষ্ঠীর সহিংসতা বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করা হয়। এসব ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে বলে দাবি করা হয়। এই বাস্তবতায় নাগরিকের অধিকারকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণে অগ্রাধিকার দেওয়া একটি প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা থেকেই এনপিএর যাত্রা শুরু হয়েছে বলে ঘোষণায় জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এনপিএর কাউন্সিল সদস্য অনিক রায়। উপস্থিত ছিলেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু, কথাসাহিত্যিক মশিউল আলম, লেখক আলতাফ পারভেজ, বাসদ (মার্ক্সবাদী)-এর নেত্রী সীমা দত্ত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বখতিয়ার আহমেদ, শিল্পী অমল আকাশ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতা দিদারুল ভূঁইয়া, কবি জাহিদ জগৎসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজন।
অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয় এবং সমবেত কণ্ঠে ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে। শেষ পর্যায়ে সঞ্চালক মীর হুযাইফা আল মামদূহ জানান, আগামী সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এনপিএর পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।