জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা দলগুলোর ‘১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য’ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। ইসলামী আন্দোলন ছাড়া বাকি ১০ দলের মধ্যে আসন সমঝোতাকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীর তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। জোটের একাধিক আসনে জামায়াতের প্রার্থীদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্ত হলেও সমঝোতার স্বার্থে প্রার্থী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে মাঠপর্যায়ে মনোমালিন্য তৈরি হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বৃহত্তর ঐক্য ধরে রাখা এবং এক ভোট বাক্স নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এসব আসনে ছাড় দেওয়া হয়েছে। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, জোট টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে জামায়াত। তবে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী।
১০ দলীয় জোট সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী ২১৫টি, এনসিপি ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৩টি, খেলাফত মজলিস ১৩টি, এলডিপি সাতটি, এবি পার্টি চারটি, নেজামে ইসলাম পার্টি তিনটি, বিডিপি দুটি এবং খেলাফত আন্দোলন একটি আসনে নির্বাচন করবে। এর মধ্যে জামায়াতের ছেড়ে দেওয়া একাধিক আসনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে।
জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের সমর্থকদের একাংশ প্রকাশ্যে প্রার্থী বাছাই নিয়ে আপত্তি তুলছেন। গত ১৫ জানুয়ারি আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা মন্তব্য ও সমালোচনা দেখা যায়।
মৌলভীবাজার-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আব্দুল মান্নানকে নিজ গ্রামে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটেছে। তিনি যাতে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে না পারেন, সে জন্য মঙ্গলবার রাজনগর উপজেলার দত্তগ্রামে নিজ বাড়িতে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। তার ছেলে ডা. তানভীর জানান, তার বাবা দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে এলাকায় কাজ করেছেন। স্থানীয় মানুষ ও কর্মী-সমর্থকেরাই তাকে বাড়িতে অবস্থান করতে বাধ্য করছেন। সেখানে দলের কোনো কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন না।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করার কারণে সাধারণ মানুষের সমর্থন পেয়েছেন তার বাবা। সে কারণেই মনোনয়ন প্রত্যাহার ঠেকাতে এলাকাবাসী বাড়িতে অবস্থান করছেন।
লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ওই আসনের জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, জামায়াত প্রার্থী নাজমুল হোসেন পাটোয়ারী মাঠপর্যায়ে ভালো অবস্থানে রয়েছেন। তাদের অভিযোগ, সমঝোতার মাধ্যমে এনসিপির প্রার্থীকে ওই আসন দেওয়া হচ্ছে, যাকে এলাকায় অনেকেই চেনেন না।
রামগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের জামায়াত নেতা সারাফাত হোসেন শাহিদের বক্তব্য, ওই আসনে এনসিপির প্রার্থী পরিচিত নন। দীর্ঘ সময় ধরে জামায়াতের নেতাকর্মীরা সেখানে কাজ করেছেন। জোটের সিদ্ধান্ত নতুন করে বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মনে করেন। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে বলেও তিনি জানান।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, এসব অসন্তোষ সাময়িক। তাদের আশা, নির্বাচনের সময় দলীয় শৃঙ্খলা বজায় থাকবে এবং নেতাকর্মীরা বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। দলটির একজন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, জোট চূড়ান্ত হওয়ার আগেই প্রার্থীদের জানানো হয়েছিল যে, দেশের স্বার্থে আসন সমঝোতার সিদ্ধান্ত আসতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রের নির্দেশনা মানতে হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে কিছুটা অভিমান থাকলেও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা নেই।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোকে একত্রে রাখতে গিয়ে কিছু আসনে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। এতে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা কষ্ট পেতে পারেন, তবে তা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করার ইঙ্গিত নয়। বৃহত্তর স্বার্থে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবেন—এমন প্রত্যাশার কথাও জানানো হয়।