ইউরোপে ক্রমবর্ধমান অভিবাসনবিরোধী ঢেউয়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক ব্যতিক্রমী নজির স্থাপন করেছে স্পেন। দেশটিতে অবস্থানরত প্রায় পাঁচ লাখ নথিবিহীন অভিবাসীকে আইনি প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে একটি বিশেষ কর্মসূচি অনুমোদন করেছে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন সরকার। গত মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়, যার আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অবৈধভাবে বসবাসরত ব্যক্তিরা দেশটিতে বৈধভাবে থাকা ও কাজ করার সুযোগ পাবেন।
স্পেন সরকারের এই উদ্যোগের ফলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন গ্রহণ শুরু হতে যাচ্ছে। দেশটির অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী এলমা সাইজ জানিয়েছেন, শুরুতে অনলাইনে আবেদনের সুযোগ থাকলেও আগামী ২০ এপ্রিল থেকে সশরীরে আবেদন জমা দেওয়া যাবে। পুরো আবেদন প্রক্রিয়া চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত। এই উদ্যোগের মাধ্যমে মূলত স্পেনের বার্ধক্যের দিকে ধাবিত জনমিতিকে চাঙ্গা করা এবং শ্রমবাজারের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী সানচেজ। তিনি এই পদক্ষেপকে একটি ‘ন্যায়সংগত ও প্রয়োজনীয়’ কাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ঘোষিত এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় আবেদন করতে হলে অভিবাসীদের বেশ কিছু কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে। আবেদনকারীকে অবশ্যই ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির আগে স্পেনে প্রবেশ করার প্রমাণ দাখিল করতে হবে এবং অন্তত পাঁচ মাস দেশটিতে অবস্থানের তথ্য দিতে হবে। এছাড়া আবেদনকারীর বিরুদ্ধে নিজ দেশ বা স্পেনে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড থাকা চলবে না। প্রাথমিক পর্যায়ে এই অনুমতি মিলবে এক বছরের জন্য, যা পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদনের পথ সুগম করবে।
রাজনৈতিকভাবে এই সিদ্ধান্তটি স্পেনে বেশ উত্তাপ ছড়িয়েছে। আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সানচেজ সরকার একটি বিশেষ ডিক্রি জারির মাধ্যমে এই আইন সংশোধন করেছে, যাতে বিরোধীদের বাধার মুখে পড়তে না হয়। এর আগে পার্লামেন্টে এই সংক্রান্ত একটি বিল পাসের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশ বিপুল সংখ্যক আবেদন সামলানোর সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সরকার দ্রুততার সঙ্গেই এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
বিরোধী দলগুলো সরকারের এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করছে। পিপলস পার্টির নেতা আলবার্তো নেজ ফেইহো এই উদ্যোগকে ‘অমানবিক ও অনিরাপদ’ বলে বর্ণনা করেছেন। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান বিরোধী দল পিপলস পার্টি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন তারাও কয়েকবার এ ধরনের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিল। সরকারের হিসাব মতে, এই কর্মসূচির ফলে সরাসরি পাঁচ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন, তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্পেন সরকারের এই নতুন ঘোষণায় দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। বার্সেলোনাসহ বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি অভিবাসীদের আনন্দ মিছিল ও উল্লাস করতে দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার একটি ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, স্থানীয় প্রবাসীরা এই সুযোগের জন্য স্পেন সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।
নথিপত্র না থাকায় এতদিন যেসব অভিবাসী মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন, তাঁদের জন্য এই ঘোষণা নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছে। মুরুল ওয়াইদ নামে একজন বাংলাদেশি অভিবাসী গণমাধ্যমকে জানান, বৈধতা না থাকায় কাজ বা থাকার জায়গা খুঁজে পেতে তাঁদের চরম সংকটে পড়তে হতো। জীবনধারণের সেই কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে এখন আইনি স্বীকৃতির সুযোগ তৈরি হওয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা স্বস্তি প্রকাশ করছেন।