আবদুল আউয়াল মিন্টু। এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি এবং রাজনীতিবিদ। বর্তমানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান মিন্টু মাল্টিমোড গ্রুপের প্রধান নির্বাহী। ‘লাল তীর সীডস লিমিটেড’-এরও চেয়ারম্যান তিনি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়বেন। পলিটিক্সবিডি টোয়েন্টিফোরের সঙ্গে আলাপচারিতায় আসন্ন নির্বাচন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিভিন্ন বিষয়ে কথা কথা বলেছেন তিনি।
পলিটিক্সবিডি টোয়েন্টিফোর: আসন্ন নির্বাচন নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : নির্বাচনে আর বিশেষ পরিকল্পনা কী? এখন তো নতুন একটা প্রযুক্তির যুগ। সবাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অর্থাৎ ফেসবুক, ইউটিউব এগুলোতে প্রচারণা চালায়, আমরাও সেটা করব। আর মেইন হলো জনগণের কাছে যাওয়া, জনগণের কাছে গিয়ে ভোট চাওয়া, যতটুকু সম্ভব আমি সেটাই করব।
পলিটিক্সবিডি টোয়েন্টিফোর: নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে আপনি কতটা আশাবাদী?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : শোনেন, সব মানুষই ভালো আশা করে। আমি মনে করি, শাসন-কর্তৃত্ব, এমপি-মন্ত্রী এগুলো আল্লাহর ওপর নির্ভর করে। আমাকে তো এরশাদ সাহেব ১৯৮৬ সালে ইলেকশন করতে বলেছিলেন। ১৯৯০ এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগও বলেছিল ইলেকশন করেন। এটা সবাই জানে। এটা তো আর লুকানোর কিছু নেই যে, আমি একসময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। আমাকে ২০০১ সালে ম্যাডামও (খালেদা জিয়া) ইলেকশন করার জন্য বলেছিলেন। কিন্তু আমি ইলেকশন করিনি। এরপর ২০০৮ সালেও ম্যাডাম বলেছিলেন; কিন্তু আমি ইলেকশন করিনি। পরবর্তীতে ২০১৮ সালেও বিএনপি থেকে আমাকে ইলেকশন করতে বলা হয়েছিল, আমি করিনি। আল্লাহর হুকুমে এবার মনোনয়ন দিয়েছেন।
পলিটিক্সবিডি টোয়েন্টিফোর: বিজয়ী হলে আপনার নির্বাচনী এলাকাসহ পুরো ফেনী জেলার উন্নয়নে কী করতে চান?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : আমি দেখলাম যে, আমাদের লোকজনের দাবি হচ্ছে একটা মেডিকেল কলেজ, একটা পাবলিক ইউনিভার্সিটি, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন—এগুলো। এ ছাড়া এমপিদের আর কী করার আছে? এমপিদের আসল কাজ হওয়া উচিত সংসদে আইন পাস করা। আর অন্যান্য দেশের উদাহরণ যদি আপনি দেখেন, ওই পার্টিকুলার জায়গার যে উন্নয়ন—সেটা নির্ভর করে স্থানীয় সরকারের ওপর। যেগুলো ওদের হাতে নেই, যেমন পাবলিক ইউনিভার্সিটি, মেডিকেল কলেজ—এসব ক্ষেত্রে আমরা দেখব যে, ফেনী জেলার যেন উন্নয়ন হয়। বলতে গেলে ২০০৬ সাল থেকেই ফেনী জেলা এক ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ওখানে উন্নয়ন তেমন কিছু হয়নি, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়নি, অন্য সেক্টরেও উন্নয়ন হয়নি। ম্যাডাম ফেনী-১ আসনে প্রার্থী হয়েছেন, উনি তো জয়লাভ করবেনই। আশা করি, ফেনী-২ আসনেও আমরা জয়লাভ করব। ফেনী-৩ আসনে আমিও আশাবাদী। আমরা যদি জয়লাভ করি এবং আমাদের দল যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে জনগণের যে চাহিদাগুলোর কথা আমরা শুনব, সেগুলো পূরণ করার জন্য সচেষ্ট থাকব।
পলিটিক্সবিডি টোয়েন্টিফোর: বিএনপি এরই মধ্যে ২৭৩ আসনে দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। প্রার্থীরা কেমন হলো?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : দেখেন—দল তো বিভিন্ন ক্রাইটেরিয়াতে চিন্তা করে মনোনয়ন দিয়েছে। কারো টাকা-পয়সা আছে, সেটা শুধু নয়; দল দেখেছে কে কর্মীবান্ধব, কে এলাকার জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশি। দল দেখেছে তার পুরোনো দিনের ব্যাকগ্রাউন্ড অর্থাৎ ভালোমন্দ দিক যেটা আছে। এগুলো সব বিচার-বিবেচনায় এনে দল মনোনয়ন দিয়েছে। অতএব, দল যাকে মনোনয়ন নিয়েছে, আমি মনে করি, সে-ই প্রার্থী ভালো। এখানে আর অন্য কিছু চিন্তা করার কোনো অবকাশ নেই। ২৭৩টি আসনের মধ্যে হয়তো ৫-১০টি মনোনয়ন নিয়ে আমাদের একটু দ্বিমত আছে; তবে সেটা কিন্তু পার্টির চিন্তাধারার সঙ্গে কোনো বিরোধ না। এটা হলো স্থানীয়ভাবে অনেকে মনে করেন যে, যিনি মনোনয়ন পেয়েছেন, তার থেকে তিনি বেশি যোগ্য। সেটা (মনোনয়ন) তো বিভিন্ন ক্রাইটেরিয়াতে চিন্তা করা হয়েছে। অতএব, আমি মনে করি, যারা মনোনয়ন পেয়েছেন তারা সবাই যোগ্য। আবার যারা মনোনয়ন পাননি, তারাও যে যোগ্য না—সেটাও বলা যাবে না। এখন কথা হলো—যোগ্যতার মাপকাঠি তো সবসময় এক থাকে না। অনেক ক্রাইটেরিয়া বা অনেক সূচক ধরে চিন্তা-ভাবনা, বিচার-বিশ্লেষণ করে সব কিছু দেখে তারপর দল মনোনয়ন দিয়েছে। অতএব, আমার মনে হয় না, এটা নিয়ে পার্টির ভেতরে বা বাইরে খুব একটা বেশি কোনো বিরোধ হবে।
পলিটিক্সবিডি টোয়েন্টিফোর: বাংলাদেশে এখন যে মূল্যস্ফীতি রেট আছে—জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি, এটার সঙ্গে সাধারণ জনগণ, নিম্ন আয়ের মানুষ কীভাবে ম্যাচ করবে?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : প্রথম কথা হলো আমাদের এই মূল্যস্ফীতি এখন গড়ে ৮ শতাংশ। গত দুই-তিন বছর থেকে প্রায় ৯ শতাংশ, তার থেকে একটু কমতে কমতে ৮ শতাংশ। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে বা গত ১৫ বছরের পরিসংখ্যানকে আমি বিশ্বাস করি না। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান এটা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্যতা পাবে না। বিভিন্ন কারণে এখন মূল্যস্ফীতি দুরকম। একটি হলো খাদ্য, আরেকটি হলো খাদ্যবহির্ভূত। সাধারণ নিয়মে যখন খাদ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়ে, তখন গরিব লোকেরা বেশি ভুক্তভোগী হয়। কারণ, একজন সাধারণ লোক দিন আনে দিন খায়। একজন রিকশাচালক ভাই বা একজন দিনমজুর, তাদের শতকরা ৭০ শতাংশ পয়সা চলে যায় শুধু খাদ্য কিনতে। যখনই খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বাড়ে, তখনই তারা বেশি ভুক্তভোগী। এখন সরকার চাইলেই কি মূল্যস্ফীতি কমাতে পারবে? আমার মনে হয় না। মূল্যস্ফীতির বিভিন্ন কারণ আছে। একটি হলো যদি মানুষের ডিমান্ডটা (চাহিদা) বেড়ে যায়, মানুষের কাছে টাকা বেশি, সেজন্য মানুষ কিনবে বেশি। বাজারে খাদ্যপণ্য মানে যদি সাপ্লাইয়ের তুলনায় চাহিদা বেশি হয়, দাম বেড়ে যাবে। আরেকটি হলো খাদ্যপণ্য নেই অর্থাৎ খাদ্যপণ্য বা যে কোনো পণ্য ঘাটতি আছে বিধায় এটার এখন দাম বেশি। ডিমান্ড বেশি, সাপ্লাই কম—বাংলাদেশে সেটা যদি হয়, তাহলে এখন বাংলাদেশ সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য যে যে নীতি অনুসরণ করছে সেটা হলো—আমি মানি সাপ্লাই কমাব। কিন্তু আপনাকে আগে দেখতে হবে যে, মানি সাপ্লাইয়ের জন্য ইনফ্লেশন হচ্ছে, না অন্য কোনো কারণে ইনফ্লেশন হচ্ছে। যদি মানি সাপ্লাই কম, ডিমান্ডও কম- তারপরও মূল্য বাড়ছে, তাহলে তো টাকার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
পলিটিক্সবিডি টোয়েন্টিফোর: কাজ করার জন্য যেটা সরকারের পলিসি, এটা কি আসলেই সঠিক?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : এটা প্রাকটিক্যালি সঠিক। কারণ, বিশ্বব্যাপী থিওরিটিক্যালি বলে যে, যদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়, তাহলে টাকার সরবরাহ যদি কমানো হয়, মানুষের কাছে টাকা কম যাবে, মানুষের ডিমান্ড কমে যাবে। অতএব, মানুষ কিনবে কম, ফলে দাম কমে যাবে। এটা হলো থিওরি। তবে সব থিওরি কিন্তু সব সমাজের বেলায় প্রযোজ্য না।
পলিটিক্সবিডি টোয়েন্টিফোর: সেক্ষেত্রে যে ইনভেস্টমেন্ট এটা করতে গিয়ে তো নেট রেজাল্টও পাচ্ছে না, আবার ইনভেস্টমেন্টও কমে যাচ্ছে।
আবদুল আউয়াল মিন্টু : এখন থেকে ২০ বছর আগে কেউ যদি ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডে যেত, ১০ ফুট-২০ ফুট পরে পরে দেখতো যে, এদিকে বিল্ডিং হয়, ওদিকে বিল্ডিং হয়, এদিকে কারখানা হচ্ছে। অর্থাৎ এখানে সবদিকে কিছু হচ্ছে। এখন ওখানে কিছু দেখে কেউ? আর সম্প্রতি পেপারে দেখলাম যে, গত কোয়ার্টারে ১৮ শতাংশ কম মূলধনী যন্ত্রপাতি এক্সিকিউট হয়েছে। এখন কথা হলো যে, যদি মূলধনী যন্ত্রপাতি কম হয়, তাহলে ইনভেস্টমেন্টটা কোথায় হইছে? আর ইনভেস্টমেন্ট হলো দুই প্রকার। একটি হলো আমাদের লোকাল, আরেকটি বৈদেশিক। লোকাল ইনভেস্টমেন্ট কোথা থেকে আসে? সেভিংস থেকে আসে। বাংলাদেশে গত চার বছরে সেভিংস কমছে, এটা বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান। যে কোনো দেশে বিনিয়োগের শতকরা ৯৭ শতাংশ আসে নিজস্ব সঞ্চয় থেকে। আমাদের যদি সঞ্চয় কমে যায়, অন্যদিকে যদি আমরা একটি সংকুচিত রাজস্ব নীতি-সংকুচিত মুদ্রা নীতি ফলো করি, তাহলে সংকুচিত রাজস্ব নীতি ফলো করতে হবে—যেমন সরকার খরচ কমাতে চায়। সরকার যদি খরচ কমায়, আর যদি মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য আমরা সংকুচিত মুদ্রানীতি ফলো করি, তাহলে বিনিয়োগটা কীভাবে হচ্ছে। আর যদি আমাদের ইনফ্লেশন ৯ বা ১০ শতাংশ হয় এবং আমাদের ওয়েজ ইনকাম ৩ শতাংশের কমও হয়, তাহলে সঞ্চয় তো হবে না। সঞ্চয় না হলে বিনিয়োগটা কোথা থেকে আসবে? বিনিয়োগের একমাত্র উপায় হলো নিজস্ব সঞ্চয় থেকে ৯৭ শতাংশ আর তিন থেকে চার শতাংশ আসবে বৈদেশিক বিনিয়োগ থেকে। যদি একটা দিনে সঞ্চয়-আয় কমে যায়, তাহলে অটোমেটিক সঞ্চয় কমে যাবে। আর সঞ্চয় কমে গেলে অটোমেটিকলি বিনিয়োগ কমে যাবে। অতএব, বিডা কী বলল, অমুক উপদেষ্টা কী বলল— এগুলো কোনো ইস্যু নয়। সোজা হিসাব—মূল্যস্ফীতি যদি ইনকাম থেকে বেশি হয়, সেখানে সঞ্চয় কমে যাবে। সঞ্চয় কমে গেলে কোনো বিনিয়োগ হবে না। বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান হবে না। কর্মসংস্থান না হলে রাস্তায় মারামারি, হানাহানি তথা অস্থিরতা চলতে থাকবে। যখনই সামাজিক অস্থিরতা হবে, সেখানে তো এমনিই বিনিয়োগ হবে না।
পলিটিক্সবিডি টোয়েন্টিফোর: আপনি ব্যাংকে দীর্ঘদিন আছেন, এখনো আছেন। পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার যে বিষয় বা আরও অন্য দুর্বল ব্যাংক ছিল, এখানে শেয়ার হোল্ডাররা আপত্তি করেছিল—তাদের দিকটা কী হবে। এখানে যারা দায়ী, তাদের কোনো দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয় আছে কি না বা এই পলিসিটাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : এটা একটি পলিসি। একীভূত করা আমি খুব কম দেশেই দেখেছি। বন্ধ করে দেওয়া অনেক দেশে দেখেছি। একীভূত করা নিয়ে এর আগেও একবার কথা হচ্ছিল। দুই-একটি একীভূত হইছেও মনে হয়। অ্যাট দ্য অ্যান্ড অব দ্য ডে, এটা তো বাংলাদেশ ব্যাংকই করছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে শেষ পর্যন্ত এটাকে ইমপ্লিমেন্ট করবে? ইমপ্লিমেন্ট করার জন্য তো তারা অনেকখানি এগিয়েও গেছে। যেমন সব বোর্ড ভেঙে দিয়েছে। সব জায়গায় প্রশাসক নিয়োগ করছে; কিন্তু আমি মনে করি—এসব জিনিস যখন করা হয়, তখন জনগণের দ্বারা গঠিত সরকার দ্বারা যদি এটা করা না হয়—তাহলে জনগণের যে চাহিদা, জনগণের যে চিন্তাধারা— এগুলো কখনো প্রতিফলিত হয় না। একটি আইসোলেটেড গোষ্ঠী কতগুলো আইসোলেটেড ডিসিশন নিচ্ছে। এগুলো শেষ পর্যন্ত কতটুকু বাস্তবায়ন হবে বা বাস্তবায়ন হওয়ার পথে কত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে, এটা এখনো বলা যাচ্ছে না। তবে আমি মনে করি, এখানে বহু প্রতিবন্ধকতা আসবে।
এখন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেই যদি এটাকে আইন মনে করেন যে, এটাকে আপনি ইমপ্লিমেন্ট করবেন—তাহলে এই যে সংসদ, গণতন্ত্র, রাজনৈতিক দল, তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা আপসরফা, সমঝোতা— এগুলোর তো তাহলে কোনো দরকার ছিল না। এটা ছাড়াও আরও অনেক কাজ আছে। আমি মনে করি, এই কাজগুলো রাজনৈতিক সরকার আসার পরে করাটাই ভালো ছিল। না হলে এগুলো পরে অনেক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। আমাদের দেশে একটি রীতিনীতি হয়ে গেছে যে, কয়েকজন লোক টাকা দিয়েছে, তারা ব্যাংকের মালিক—আসলে এ কথা সত্য না। ব্যাংকের প্রথম মালিক হলো ব্যাংকের ডিপোজিটর। সেকেন্ড হলো যারা ঋণ নেয় তারা। তিন নম্বরে হলো যারা ব্যাংকে কিছু মূলধন জোগান দেন তারা। এখন তিন নম্বর এসে বলছে যে, আমি মালিক। তিন নম্বরও মালিক না, এক নম্বরও মালিক না, দুই নম্বরও মালিক না। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে আমরা মালিক। এখন এগুলোর ভেতরে অসংলগ্নতা আছে। এগুলো শেষ পর্যন্ত কতটুকু টিকবে এবং যৌক্তিকতা কতটুকু দেখাতে পারবে, এটা আমার কাছে এ মুহূর্তে বিশ্বাসযোগ্য না।
পলিটিক্সবিডি টোয়েন্টিফোর: বাংলাদেশ ব্যাংক যদি মালিকই মনে করে বা ব্যাংকগুলো তদারক করার জন্য সে দায়িত্ব পাচ্ছে, রেগুলেট করবে; কিন্তু যখন এই ব্যাংকগুলোতে এই অনিয়মগুলো হচ্ছিল, তখন তাদের কনসার্ন ডিপার্টমেন্ট কাজ করেনি কেন বা বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশনে গেল না কেন—কিংবা অ্যাকশনে যাওয়া উচিত ছিল কি না বা এই ভূমিকাটা কী?
আবদুল আউয়াল মিন্টু : আমি তো ১৯৮৩ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ব্যাংকের ডাইরেক্টর ছিলাম এবং তখনকার দিনে প্রাইভেট সেক্টরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ছিল সেটা। এখন কিন্তু আমি নতুন করে ডাইরেক্টর হয়েছি। মধ্যখান থেকে ২০০৭-২০২৪ পর্যন্ত আমি কিন্তু ডাইরেক্টর ছিলাম না। যে ধরনের অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা, নৈতিকতাবিহীন কাজ, দুর্নীতি—এটা আমি কোনোদিন বিশ্বাস করতাম না, যদি আমি এই ব্যাংকে আবার ডাইরেক্টর না হতাম। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সবকিছুই হয়েছে কিন্তু আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাকের ডগা দিয়ে। এমন কিছু নেই, যেটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানতো না এবং অনেক কিছু আছে, যেগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাপ্রুভালও আছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে ব্যাংকের পরিশোধের ওপর। এবার একটি কথা বলি, আমাদের রেগুলেটরি ওভাররিচ কোন পর্যায়ে গেছে যে, বাংলাদেশে একটি ব্যাংকে যখন এমডি নিযুক্ত করা হয়, এটা কিন্তু বোর্ড এমনে নাম পাঠায়। বাংলাদেশ ব্যাংক ইন্টারভিউ নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ইন্টারভিউ নেওয়ার পরে উনি কত টাকা বেতন পাবেন, সেটাও ধার্য করে দেয়। আমি নিজে চেয়ারম্যান হওয়ার পরে বারবার বলছি সার্কুলার দাও যে, চেয়ারম্যানের দায়িত্বটা কী। আজ পর্যন্ত আমি কোনো দায়িত্ব খুঁজে পাইনি। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এমডি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে ইন্টারভিউ নিয়ে এবং বেতনও ঠিক করে— তাহলে এখানে পরিষদের দায়িত্বটা কী। পৃথিবীর একটি দেশও নেই যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমডি নিয়োগ করে। এরকম প্রতিটি ধাপে ধাপে এত রেগুলেশনস করা হয়েছে, এখানে তো কিছুই খারাপ হওয়ার কথা না; কিন্তু যত খারাপ বাংলার ব্যাংকিংয়ে হয়েছে, এটা পৃথিবীর আর কোথাও হয়নি। এটা গভর্নর সাহেব নিজেও বলেছেন। এখন কথাটি হলো যে, অনেক রেগুলেশন করা হয়েছে যেগুলোর কোনো দরকারই নেই। আবার অনেক রেগুলেশন নেই; কিন্তু সংস্কার তো করা হচ্ছে। তাদের সংস্কারের ভেতরে আমি পেপারে দেখি যে, গভর্নর সাহেবের পজিশন মন্ত্রীর সমান হবে। তারপর আরও দু-একটি দিক, যেগুলোর সঙ্গে আর্থিক সেক্টরের উন্নয়নের কোনো সম্পর্ক নেই। এখন তারা নিজে নিজে এগুলো করছেন। একটি সময় আসবে ঘষামাজা তো করা হবে। যখন নির্বাচিত সরকার আসবে, তখন এই যে প্রজ্ঞাপন দিয়ে যেগুলোকে আইন বলা হচ্ছে, এগুলো তো ঘষামাজা করা হবে। নিয়ম হলো যে—প্রজ্ঞাপন দিয়ে আইন বানানো বিষয়গুলো সংসদ বসার পরে যদি ছয় মাসের ভেতরে অ্যাপ্রুভাল না হয়, সংসদে তাহলে এগুলো অটোমেটিকলি বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি এগুলো সংসদে ওঠানো হয়, তাহলে সেগুলো কিন্তু সংসদ সদস্যরা ভালো-মন্দ বিচার করে আইন পাস করবে। একটি উদাহরণ দেওয়া লাগতে পারে যে, ২০০৭-০৮ এ প্রায় ১৮৯টি আইন সংস্কার করা হয়েছিল। যতটুকু আমি জানি, গত সরকারগুলো বলছিল যে, এসব আইন সংসদে পাস করে দিব; কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল যে, ১৫ বছরে মাত্র ছয়টি বা সাতটি আইন সংসদে উঠিয়েছে এবং এই আইনগুলো যখন পাস করেছে—এমনভাবে কাটাছেঁড়া করেছে যে, এটা আগের আইন থেকেও খারাপ—এটাই হবে এখন। তারা নিজে নিজে আইন করলে তো হবে না। আইন করার একটি যথাযথ পদ্ধতি আছে। সে পদ্ধতি অনুসরণ না করে নিজেদের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করার জন্য যদি আপনি নিজে নিজে একটি আইন বানিয়ে দেন, সে ক্ষমতা তো আপনি ব্যবহার করতে পারবেন না। শুধু যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তা না; আর্থিক সেক্টর শুধু না, অর্থনীতির অন্যান্য সেক্টরেও একই অবস্থা।
পলিটিক্সবিডি টোয়েন্টিফোর: আপনি বিজনেস কমিউনিটির লোক, অন্যভাবে দেখলে আপনি একজন রাজনীতিবিদও। আসন্ন নির্বাচনে আপনি আপনার দল বিএনপি থেকে সরাসরি নির্বাচন করছেন, আপনি নির্বাচিতও হবেন বলে আমরা আশা করি। আগামীতে যদি আপনাদের দল অর্থাৎ বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়, সেক্ষেত্রে এই পলিসিগুলো চেঞ্জের ক্ষেত্রে আপনার কতটা ভূমিকা থাকবে কিংবা এ ক্ষেত্রে আপনি কতটা সক্ষম হবেন বলে মনে করেন? কারণ, এখানে আমলাতন্ত্র আছে, রাজনৈতিক মতভিন্নতাও রয়েছে।
আবদুল আউয়াল মিন্টু : বাংলাদেশে তো প্রধান প্রতিবন্ধকতা আমলাতন্ত্র। সবাই বলে, সত্য-মিথ্যা পরে যাচাই হবে। এটার কোনো সংস্কার করছে? সংস্কার নিয়ে বলা যায় আমি তো যুদ্ধ করছি ২০০০ সাল থেকে। ২০০৪ সালে আমি ফরমালি পাবলিকলি সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছি; সেটা নিয়েও তো আমার ওপরে বেশ কিছু হয়েছে; কিন্তু আমি তো সংস্কার সংস্কার করে আসলাম। এই সরকার তো এসে বলেছে যে, আমরা সংস্কার করব। তো কী সংস্কার করবে? এখন সংস্কারে যাদের দিয়ে কমিটি করা হয়েছে, কেউ ভাই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে না। তবে আমার যদি সুযোগ হয়, আল্লাহ যদি সে সুযোগ দেন, আমি পারসোনালি বিজনেস কমিউনিটির পক্ষে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের লক্ষ্যে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে যতটুকু করার—সেটা অবশ্যই আমি করব। তাছাড়া আমার তরফ থেকে সংস্কারের ব্যাপারে যতটুকু বলার কথা, চেষ্টা করার কথা, সেটা তো আমি করবোই; কিন্তু আমরা যেভাবে বলি, সংস্কার এভাবে হয় না। তাছাড়া এটা তো একক ব্যাপারও না, সংস্কারের জন্য একটি জাতীয় ঐকমত্য দরকার হয়; কিন্তু ইদানিংকালে এ সংস্কার সংস্কার করে জাতীয় ঐক্যের পরিবর্তে জাতীয় অনৈক্য বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা কীভাবে সামাল দেবে, আমি জানি না। এটা সামলানোর পরেই না আমাদের রোলটা (ভূমিকা) আসবে।