বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও বরগুনা-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, দেশের সংবিধান অনুযায়ী হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে। নাগরিকদের এ রকম অধিকার ভোগ করার নিশ্চয়তা একমাত্র বিএনপিই দিচ্ছে। তার মতে, বেহেশতের কথা বলে ধর্মভিরু মানুষের ভোট নেয়াটাই জামায়াতের মূল উদ্দেশ্য। এটা স্ট্যান্ডবাজি ছাড়া কিছুই নয়।
নুরুল ইসলাম মনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। বরগুনা-২ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৮৮ ও ১৯৯১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এবং ২০০১ সালে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য হন। একই আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনেও বিএনপি থেকে নির্বাচন করছেন তিনি।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামীই এখন বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এই বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনীতির মাঠে অনেক খেলোয়াড় থাকবে। সেই খেলোয়াড়ের মধ্যে যিনি ভাল করবেন, তিনিই জয়ী হবেন- এটাই হলো সত্য। জামায়াতে ইসলামী এক সময় বিএনপির কাঁধে চড়ে এ দেশে আঠারটা সিট পেয়েছে, তখন বিএনপির জোটে ছিল জামায়াত। এখন জামায়াত যদি মনে করে তারা আলাদাভাবে নির্বাচন করবে, করতেই পারে। পতিত আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগের দোসররা ব্যতিত সব রাজনৈতিক দলের কাছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আহ্বান এ রকম- সমগ্র দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটা দেশ বিনির্মাণে সহযোগিতা করবে। তাদের তিনি বলেছেন, চলুন- নির্বাচনের পরে আমরা একটা জাতীয় সরকার গঠন করি। এই জাতীয় সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটটা এ রকম যে, ধরুন- এই দেশটা নষ্ট হয়েছে, আমরা সবাই মিলে এ দেশটা বিনির্মাণ করব।
একাত্তর সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক মানুষ মেরে জামায়াত এখন বলছে যে, আমাদের ভুল হয়ে গেছে, আমরা ক্ষমা চাই। আবার এই কার্যক্রমের (বিএনপির বিরোধিতা, সমালোচনা) জন্য একদিন তারা জাতির কাছে ক্ষমা চাইবে। এই দেশটা বিনির্মাণ করার সুযোগ ছিল, কিন্তু সেটা নষ্ট করছে।
নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু ভোটার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি সংখ্যালঘু শব্দে বিশ্বাস করে না। আমরা বিশ্বাস করি, এ দেশের সকল মানুষ এ দেশের নাগরিক। সংবিধান যে স্বীকৃতি দিয়েছে, একজন নাগরিকের জন্য যে অধিকার সংরক্ষণ করেছে, সে অনুযায়ী দেশে একজন হিন্দু একজন বৌদ্ধ একজন খ্রিস্টান একজন মুসলমান একই অধিকার ভোগ করবে। এ রকম অধিকার ভোগ করার নিশ্চয়তা একমাত্র বিএনপিই দিচ্ছে। তাই আমি মনে করি, দল-মত নির্বিশেষে তারা বিএনপির পাশেই দাঁড়াবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে কথা বলেছেন যে, দেশে কোনো সংখ্যালঘু নেই। এই রাষ্ট্র তারা বিনির্মাণ করবেন এবং সেটা বাস্তবায়নের জন্য আজকে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আরেকটা হলো- ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। সুতরাং সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র একটা মানুষের পাশে দাঁড়াবে। দুঃসময়ে-অসুবিধায়, বিপদে-আপদে রাষ্ট্র পাশে থাকবে, এ কথা তারেক রহমান বলেছেন। তবে স্ট্যান্ডবাজি কিন্তু করা যায়, স্ট্যান্ডবাজি যেকোনো লোক করতে পারে। আপনি একজন হিন্দু প্রার্থীকে দাড় করিয়ে দিলেন যে, আমরা হিন্দুদের পক্ষে। জামায়াত ফান্ডামেন্টালি দল, তারা ইসলামের শাসন কায়েম করবে। কিন্তু হিন্দুরা ইসলামের শাসন কায়েম করবে কেন? এটা সাধারণ প্রশ্ন। মূলত স্ট্যান্ডবাজি করার জন্য তারা একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে প্রার্থী করেছে, এটা তো খুব দুঃখজনক। আমাদের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ভাইয়েরাও এটা বোঝার চেষ্টা করবেন। বলা হচ্ছে, জামায়াতে ভোট দিলে তিনি জান্নাতে যাবেন। আচ্ছা-ধরুন, জান্নাতে যাবে সব মুসলমান। তাহলে এই হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ভাইয়েরা যাবে কোথায়? কাজেই এই স্ট্যান্ডবাজি করার কোনো মানে হয় না। আর স্ট্যান্ডবাজিতে বুঝা যায়- এটা ধাপ্পাবাজি, এটা ভণ্ডামি। আপনি যা, সেটাই বলেন। আপনি ময়ূরকে ময়ূরই বলেন, কাককে কাকই বলেন। কিন্তু ময়ূরকে কাক কিংবা কাককে ময়ুর বলবেন না। যদি আপনি ইসলামের শাসনই কায়েম করতে চান এবং সেটাই করেন, তাহলে সেটা তো আপনি অন্য কোনো ধর্মের লোক দিয়ে নয়, সেটা আপনার নিজের ধর্মের লোক দিয়েই কায়েম করবেন। হিন্দুদের ভোট নেওয়ার জন্য এটা জামায়াতের একটা স্ট্যান্ডবাজি। আমি বিশ্বাস করি, সারা দেশের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ভাইয়েরা বিশেষ করে হিন্দু ভাইয়েরা এই বিষয়টা বুঝবে যে, এটা জামায়াতের ধাপ্পাবাজি-চালবাজি।
অনেক জামায়াত নেতা বেহেশতের টিকিট বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে জান্নাতে যাবে, আর দাঁড়িপাড়ায় ভোট না দিলে জাহান্নামে যেতে হবে।
এই বিষয়ে তিনি বলেন, কতো কথাই তো বলা যায়। এ কথার তো ব্যাখ্যাও অনেক হতে পারে। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হলেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি তার জীবদ্দশায় তো দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেননি, সাহাবারাও দেননি।
গাউস-কুতুব-আউলিয়া-আম্বিয়া-সালেহিন-শাহিদিন-তাবেঈন কেউই দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেননি। পৃথিবীতে ৫২টা মুসলিম দেশ আছে, এর মধ্যে ৫১টা দেশে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নেই। দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে যদি জান্নাত নিশ্চিত হয়, তাহলে এসব মুসলিম দেশের লোকেরা কোথায় যাবে? এটা জাস্ট স্ট্যান্ডবাজি। যদি দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে বেহেশত নিশ্চিত হয়, তাহলে আপনি ২০১৮ সালে কেন ধানের শীষে নির্বাচন করলেন? আপনার এতো ক্ষমতা যে, কেউ মারা গেলে আপনি তাকে জান্নাতে পাঠাতে পারবেন। এতো ক্ষমতা যদি আপনার থাকে, তাহলে পৃথিবীতে ক্ষমতার দরকার কী? তাছাড়া আপনি যদি জান্নাত দিতেই পারেন অর্থাৎ আপনার যদি জান্নাতের এতো গ্যারান্টি থাকে, আপনি যদি জান্নাতের টিকিট বিক্রি করেন, আপনার কাছে এতো জান্নাত আছে- তাহলে আপনার নামাজ পড়া কিংবা রোজা রাখার দরকার কী? জান্নাত তো আপনার কাছেই আছে। মূলত এ কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, ধর্মভিরু মানুষকে নরম বানানোর চেষ্টা করা এবং তার ভোটটা নেয়া। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন যে, ভোটটা নেওয়ার পরে অর্থাৎ ক্ষমতায় গেলে তারা শরীয়াহ আইন চালু করবে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি শরীয়াহ আইন চালু না করে, তাহলে কোরআনের কার্যক্রম কীভাবে করবেন? তাহলে আমি আর উনার মধ্যে ডিফারেন্সটা কী? আমরা একটা লিবারেল ডেমোক্রেসিতে বিশ্বাস করি। সেখানে সকল ধর্মের-সকল মতের লোকের জায়গা আছে। আমরা ডেমোক্রেসিতে বিশ্বাস করি এবং আমাদের দেশকে বিশ্বাস করি।
তরুণ ভোটারদের বিষয়ে তিনি বলেন আমি মনে করি, তরুণ ভোটাররা বিএনপিকেই ভোট দেবে। প্রথমত কারণ হলো, তারেক রহমান তরুণদের ব্যাপার নিয়ে ভাবেন এবং তরুণদের জন্য তার স্পেসিফিক প্রোগ্রাম আছে। তরুণদেরকে শিক্ষিত করা, স্কিলড করা, রেসপেক্টিভ ক্ষেত্রে স্কিলড করে তাদের কাজে লাগানো- এ প্রোগ্রাম শুধু তারেক রহমানের আছে। তারপর তিনি বেকার ভাতা দিবেন এই তরুণদের জন্য, যারা এখন বেকার আছে। তবে আমরা তো দীর্ঘদিন বেকার ভাতা দিতে পারব না, সে পরিস্থিতি তো দেশে নেই। কিন্তু এর মধ্যেই শিক্ষাকে তিনি এই পর্যায়ে নিয়ে যাবেন যে, তরুণদের শিক্ষিত করে ট্রেনিং দিয়ে দেশে অথবা বিদেশে কাজে লাগাবার ব্যবস্থা করবেন। আমি মনে করি, এটা করতে পারলে তরুণদের বিরাট মুক্তি আসবে। নতুবা তরুণরা হয়তো অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। তরুণ ইয়াবা খায়, ইয়াবা বিক্রি করে, গাজা খায়, ফেনসিডিল খায়। কাজেই এখান থেকে তাদের বের করে আনা, নিজেরা স্বচ্ছল হওয়া, স্বাবলম্বী হওয়া, সংসার দেখা। এই দায়িত্ব যাতে পালন করতে পারে, সেজন্য যতটুকু স্কিলড করা দরকার, সেভাবে করে আমরা তরুণদের কাজে লাগাবো। এ কারণেই আমরা প্রত্যাশা করি, তরুণরা বিএনপিকে ভোট দিবে। তরুণদের মুক্তির পথ তো আমরাই দেখাতে চেষ্টা করি; আর তো কেউ মুক্তির পথ দেখায় না, বরং তারা (জামায়াত) দেখায় মৃত্যুর পথ অর্থাৎ মারা গেলে তারা জান্নাতে পাঠাবে, মানে তাড়াতাড়ি মরতে হবে। অন্যদিকে আমরা তরুণদের বাঁচিয়ে রাখতে চাই, তাদের স্বাবলম্বী করতে চাই।
এখন গণতন্ত্র বিনির্মাণ, গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন খুবই জরুরি। দেশে বিদেশি বিনিয়োগ যদি না হয়, তাহলে এই তরুণদের কী করে এড্রেস করবেন? একটি দলের এক নেতা বলেছেন যে, মেয়েদের কর্মঘন্টা পাঁচ ঘন্টা করবেন। কাজের শিফট হলো আট ঘন্টা, তাহলে তিন ঘন্টা কাজ কে করবে? দুই কোটি মেয়েরা যদি তিন ঘন্টা কাজ না করে, তাহলে ছয় কোটি ঘন্টা কাজ হবে না।
ফ্যাক্টরির মালিক যখন দেখবেন যে, পাঁচ ঘন্টার কাজ করে আট ঘন্টার বেতন দিতে হচ্ছে- স্বাভাবিকভাবেই সেখানে মেয়েদের রিক্রুটমেন্ট বন্ধ করে দিবেন। এর মধ্য দিয়ে মেয়েদের অনায়াসে ঘরে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ৯ কোটি মানুষের কাজকে একেবারে নিষ্ক্রিয় করে দিলেন। এটা দেশ ধ্বংস করার একটা কৌশল। তাদের প্রোগ্রামটাই হলো দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর করা। অর্থনীতি ভঙ্গের এই প্রোগ্রাম পৃথিবীর কোনো সুস্থ মানুষ নেয় কিনা, জানা নেই। সৌদির মতো দেশে গেলে দেখবেন, সব জায়গায় মেয়েরা এখন কাজ করছে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বাইরে রেখে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
টিবিএফ/