বিজয়ের মাসেই চিরবিদায় নিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান বীর সেনানী, মুক্তিবাহিনীর উপ-সর্বাধিনায়ক ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রথম প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার, বীর উত্তম। বার্ধক্যজনিত কারণে শনিবার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
শনিবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে এ কে খন্দকারের মৃত্যু সংবাদ নিশ্চিত করেন। তিনি লেখেন, ‘আব্দুল করিম খন্দকার, যিনি এ কে খন্দকার নামেও পরিচিত, ছিলেন একজন প্রকৃত বীর ও সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে তিনি নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আল্লাহ তাকে জান্নাতে সুন্দর একটি স্থান দান করুন।’
এ কে খন্দকার ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন প্রখ্যাত সামরিক নেতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত আগে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর দ্বিতীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৭১ সালে তিনি মুজিবনগর সরকারের অধীনে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন এবং ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে প্রশিক্ষণ ও সামরিক অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে তার নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে বাংলাদেশের প্রথম বিমান ইউনিট ‘কিলো ফ্লাইট’। সীমিত জনবল ও সরঞ্জাম নিয়ে গঠিত এই ইউনিট মুক্তিযুদ্ধে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে অংশ নেয় এবং আকাশপথে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আঘাত হানতে সক্ষম হয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক মুহূর্তে মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধি হিসেবেও উপস্থিত ছিলেন এ কে খন্দকার। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ বিমান বাহিনী পুনর্গঠনের দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত হয়। তিনি দেশের প্রথম বিমান বাহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পালন করেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৩ সালে তাকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। পরে ২০১১ সালে তিনি দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। তার নামে ঢাকার কুর্মিটোলা বিমান ঘাঁটির নামকরণ করা হয়েছে।
এ কে খন্দকারের জন্ম ১৯৩০ সালে বাবার কর্মস্থল রংপুরে। তার আদি নিবাস পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার পুরান ভারেঙ্গা গ্রামে। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন ও ১৯৪৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর ১৯৫২ সালে তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে কর্মরত অবস্থায়ই তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
সামরিক জীবনের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও সক্রিয় ছিলেন এ কে খন্দকার। এইচ এম এরশাদের সরকারের সময় প্রথমবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-২ (বেড়া–সুজানগর) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভায়ও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিচারণা নিয়ে লেখা তার গ্রন্থ ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।
এ কে খন্দকার দুই ছেলে, এক কন্যা ও তিন নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। এর আগে চলতি বছরের ৮ জুন তার সহধর্মিণী ফরিদা খন্দকার ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।
তার মৃত্যুতে দেশ হারাল এক বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রজ্ঞাবান সামরিক নেতা এবং রাষ্ট্রগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এক ইতিহাসস্রষ্টাকে।