ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মুলতবি বৈঠকে প্রথমবারের মতো সভাপতিত্ব করলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। রোববার (২৯ মার্চ) দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাষণে তিনি সংসদকে ‘মজলুমদের সংসদ’ হিসেবে অভিহিত করে নিরপেক্ষতা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জাতীয় সংসদ কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়, বরং এটি জনগণের সার্বভৌমত্বের কেন্দ্রবিন্দু।
সংসদ পরিচালনায় পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল জানান, তিনি ইতোমধ্যে সরকারি ও দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘স্পিকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমি প্রতিটি সদস্যের অধিকার, মর্যাদা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে কাজ করব।’ তিনি উপস্থিত সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘হযরত আবু বকর (রা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে বলছি, আমি সঠিক পথে থাকলে আপনারা আমাকে সাহায্য করবেন, আর ভুল করলে শুধরে দেবেন। কারণ, এই সংসদে আমার চেয়েও অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান অনেকে রয়েছেন।’
এবারের সংসদকে বিশ্বের ইতিহাসে বিরল উল্লেখ করে আবেগঘন কণ্ঠে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘এই সংসদের সদস্যরা বিভিন্ন প্রতিকূলতা পেরিয়ে এসেছেন। কেউ এসেছেন ফাঁসির মঞ্চের কনডেম সেল থেকে, কেউ আয়নাঘরের বিভীষিকা পার করে, কেউ দীর্ঘ নির্বাসন থেকে, আবার কেউবা গুম-নির্যাতনের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে। আমরা সবাই এখানে মজলুম হিসেবে সমবেত হয়েছি।’ ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানকে গণতন্ত্রের নতুন দ্বার হিসেবে বর্ণনা করে তিনি শহীদ আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরাম ও মীর মুগ্ধসহ সকল শহীদ ও আন্দোলনে নির্যাতিতদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
ভাষণের শুরুতে তিনি সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নিজের নির্বাচনী এলাকা কলমাকান্দা-দুর্গাপুরের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ হিসেবে স্বীকৃত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
বিখ্যাত আইনবিদ এভি ডাইসির উদ্ধৃতি দিয়ে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। সরকার হোক বা জনগণ, সবাইকে আইনের অধীনে থাকতে হবে।’ যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার সুবাদে প্রত্যক্ষ করা ওয়েস্টমিনস্টার স্টাইলের গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। সবশেষে, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গঠনমূলক সমালোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই সংসদ হবে জাতির দর্পণ এবং এর একমাত্র লক্ষ্য হবে জনগণের কল্যাণ ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।