সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির লক্ষ্য হলো দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে ন্যূনতম নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ বহুদিনের। প্রতিবন্ধী ভাতা, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা—বিভিন্ন খাতে সরকারি সহায়তা থাকলেও উপকারভোগী নির্বাচন থেকে শুরু করে অর্থ বিতরণ পর্যন্ত নানা স্তরে অভিযোগ উঠে এসেছে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, বরাদ্দ কম হওয়ার পাশাপাশি অনিয়মের কারণে প্রকৃত প্রতিবন্ধীরা ভাতার সুবিধা ঠিকমতো পান না। ইউনিয়ন পর্যায়ে ভাতার কার্ড দিতে বেআইনিভাবে টাকা নেওয়া, এমনকি ভাতার অর্থের অংশ আত্মসাতের অভিযোগও উঠে আসে। প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ, সুবর্ণ কার্ড ও ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে একশো থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুস নেওয়ার অভিযোগ ছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের সময়ক্ষেপণ ও অনিয়মের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
শুধু প্রতিবন্ধী ভাতা নয়, অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতেও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ আছে, তালিকা প্রণয়নের সময় পছন্দের লোকজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রকৃত অভাবীরা বাদ পড়েন, আবার সচ্ছল ব্যক্তির নাম তালিকায় উঠে আসে। কোথাও অনলাইন আবেদনের নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়, কোথাও প্রকৃত উপকারভোগীকে বাদ দিয়ে কার্ড অন্যের কাছে পৌঁছে যায়। এই অনিয়মের কেন্দ্রে থাকে তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহির অভাব।
এমন প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠনের পরপরই এ কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেয়। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনি প্রচারে বিষয়টি গুরুত্ব দেন। ইশতেহার অনুযায়ী, নারীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে পরিবারভিত্তিক কার্ড দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে একজন নারী দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা নগদ সহায়তা বা সমমূল্যের নিত্যপণ্য পাবেন।
সরকার ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৫ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে। দুজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী এতে রয়েছেন। ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ আছে। প্রাথমিকভাবে আট বিভাগের আট উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম চালুর কথা বলা হয়েছে। পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু জানিয়েছেন, শুরুতে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কর্মহীন ও প্রান্তিক নারীদের জন্য মাসিক আড়াই হাজার টাকা ছোট নয়। তবে প্রশ্নও কম নয়। কারা এই কার্ড পাবেন? বয়সসীমা কী হবে? সচ্ছল বা চাকরিজীবী নারীরা কি এর আওতায় আসবেন? যদি এক কোটি নারীকে সহায়তা দেওয়া হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান কীভাবে আসবে?
দেশের অর্থনীতি চাপে রয়েছে। বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থান কমেছে। এ অবস্থায় সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন, তবে সেই অর্থের উৎস ও ব্যবস্থাপনা স্পষ্ট না হলে কর্মসূচি টেকসই হবে না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অতীতের ভাতা কর্মসূচির মতো এই উদ্যোগও কি অনিয়মের জালে আটকে যাবে? যদি উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠবে। এতে প্রকৃত সুবিধাভোগী বঞ্চিত হবেন, আর কর্মসূচি বিতর্কিত হবে।
এ কারণে শুরুতেই কিছু বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথমত, উপকারভোগী নির্বাচন হবে তথ্যভিত্তিক ও ডিজিটাল যাচাইয়ের মাধ্যমে। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, বায়োমেট্রিক যাচাই ও আয়-সম্পদের তথ্য সমন্বয় করে একটি একক সামাজিক নিবন্ধন ডাটাবেইজ গড়ে তোলা দরকার। ডুপ্লিকেট ও ভুয়া নাম শনাক্তে প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সুপারিশ বন্ধ করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির একক প্রভাবের বদলে নিরপেক্ষ কমিটি ও প্রশাসনিক যাচাই বাড়ানো দরকার। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের এ প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা উচিত।
তৃতীয়ত, তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর তা উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করতে হবে। কেউ বাদ পড়লে বা অযোগ্য ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হলে যেন সহজে অভিযোগ জানানো যায়। অভিযোগ পেলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত অভ্যন্তরীণ ও স্বাধীন অডিটও প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থ বিতরণের পদ্ধতি। যদি এটি এটিএম কার্ডের মতো হয়, তাহলে প্রান্তিক নারীরা তা ব্যবহার করতে পারবেন কি না, সেটি বিবেচনায় নিতে হবে। অন্যের সহায়তায় অর্থ তুলতে গিয়ে নতুন করে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হওয়া উচিত নয়।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কেবল অর্থ বিতরণ নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থার বিষয়। ফ্যামিলি কার্ড প্রকৃত উপকারভোগীর হাতে পৌঁছালে এটি নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে একটি ভালো উদ্যোগও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেতে পারে।