দ্য গার্ডিয়ানের সম্পদকীয়
২০২২ সালে যখন রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন ইউরোপসহ সারা বিশ্বের নেতারা এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে বিশ্বনেতারা জানতেন যে, কেবল আইনি হুমকি দিয়ে রাশিয়ার হামলা থামানো যাবে না, তবুও তারা ওই ঘটনাকে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তবে ইরান ও লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই একই দেশগুলোর ভূমিকা সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্পেন ও নরওয়ের মতো হাতেগোনা কয়েকটি দেশ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে সরব হলেও অধিকাংশ পশ্চিমা শক্তিই এখন নীরব। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এই যুদ্ধে নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়েছেন এবং জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ বিষয়টিকে মিত্রদের সমালোচনা করার উপযুক্ত সময় নয় বলে মন্তব্য করেছেন।
যুদ্ধের ভয়াবহতা ইউক্রেনের মতোই ইরানেও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আছড়ে পড়েছে। তথ্যমতে, ইরানে এরই মধ্যে এক হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় ১৭৫ জন নিহত হওয়ার ঘটনা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে, যাদের অধিকাংশই ছিল শিশু। বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ এই হামলার দায় যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই নির্দেশ করছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধের সময় শত্রু পক্ষকে কোনো সুযোগ না দেওয়ার ঘোষণা বা নির্বিচার হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন যে শত্রুদের কোনো প্রকার ছাড় বা ‘ক্ষমা’ করা হবে না। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহর পাল্টা হামলার অজুহাতে লেবাননে ইসরায়েলি হামলাও মারাত্মকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, যার ফলে বিশাল জনপদ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্বের এই ‘নির্বাচিত ক্ষোভ’ এবং দ্বৈত মানদণ্ড এখন সাধারণ মানুষের কাছেও স্পষ্ট। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় যে প্রবল আবেগ ও নৈতিক অবস্থান দেখা গিয়েছিল, গাজার গণহত্যা বা ইরানের মানবিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে তার অনুপস্থিতি একটি বার্তাই দিচ্ছে—বিশ্বের সব মানুষের জীবনের মূল্য সমান নয়। এর আগেও ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ বা ক্যারিবীয় অঞ্চলে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযানের সময়ও মিত্র দেশগুলোর এমন নির্লিপ্ততা দেখা গিয়েছিল। বারবার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের এই প্রবণতা বিশ্বজুড়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে যেখানে শক্তিধর দেশগুলো মনে করছে যে তারা আইনের ঊর্ধ্বে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই দ্বিমুখী আচরণের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার তাড়না। তবে কেবল কৌশলগত কারণে আন্তর্জাতিক আইনকে বিসর্জন দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী হতে পারে। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. তামের মরিস এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনের উদ্দেশ্য কে নৈতিকভাবে ভালো তা নির্ধারণ করা নয়; বরং এমন একটি বিশ্বে শৃঙ্খলা বজায় রাখা যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রই মনে করে যে তারা সঠিক উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করছে।’
বর্তমানে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জসহ অনেক নেতাই যুদ্ধের প্রভাব দেখে কিছুটা নমনীয় বা সমালোচনামূলক অবস্থান নিচ্ছেন। তবে কেবল নৈতিক বা কৌশলগত জায়গা থেকে নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থেই আন্তর্জাতিক আইনকে সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর করা জরুরি। নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার পতনের বিষয়ে যারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তারা যদি নিজেরাই সেই আইন ক্ষয়ের নেপথ্যে ভূমিকা রাখেন, তবে পুরো পৃথিবী এক চরম অনিশ্চয়তা ও বিপদের মুখে পড়বে।
অনুবাদ: নজরুল ইসলাম নয়ন, সাংবাদিক