রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে একটি আস্ত যাত্রীবাহী গাড়ি পড়ে যাওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। দেখে বোঝার উপায় নেই এটি কি কোনো ছবির শুটিং নাকি বাস্তব চিত্র। কোনো সিনেমার শুটিং হলে ভালো হতো, কিন্তু বাস্তব বড় নিষ্ঠুর। ৫০ জন যাত্রী নিয়ে চোখের সামনে বাসটি পদ্মা নদীতে ডুবে গেল। কয়েক মিনিটে ২৬ জন মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে গেছে।
সারা দেশে ঈদ আনন্দ নিমিষে বিষাদে পরিণত হয়েছে। সংবাদপত্রে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বজনদের আহাজারির যে ছবি ছড়িয়ে পড়েছে তার দিকে তাকানো যায় না। যাত্রীবোঝাই একটি বাস ৪০ ফুট পানির নিচে চলে গেলে যাত্রীদের ভাগ্যে কী ঘটতে পারে তা অনুমান করা কঠিন নয়।
পিতার হাত থেকে দুই বছরের সন্তান ছিটকে যায় পানির মধ্যে, একজন মা নিজের জীবনের বিনিময়ে কোনোক্রমে ছেলেকে বাঁচানোর মতো মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের স্নায়ুকে অবশ করে দেয়।
ঈদের সময় এত বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপদে বাড়ি যাওয়া ও ফিরে আসার ব্যবস্থাপনা মোটেও সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে দুই ঈদের সময় সরকারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। এটা স্বীকার করে নেওয়ার পরও প্রশ্ন আসে—এই ধরনের দুর্ঘটনা কি নিছক দুর্ঘটনা?
কেবল ঈদের সময়ই নয়, বাসে বা লঞ্চে এই ধরনের দুর্ঘটনা সারা বছরই ঘটতে দেখা যায়। এ কথা বললে বেশি বলা হবে না যে, বছরব্যাপী আমাদের সড়কগুলো যেন মৃত্যুর মিছিলের জন্য তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। গত বছর ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮১২ জন।
২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২ হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন। এ সংখ্যা যথাক্রমে মোট দুর্ঘটনার ৩৭.৪ শতাংশ, নিহতের সংখ্যার ৩৮.৪৬ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যার ১৪.৯৮ শতাংশ।
সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যের মৃত্যু কিংবা আহত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে পড়ে থাকা ওই পরিবারের জন্য কী দুর্বিষহ হতে পারে তা অনুমান করাও কঠিন। এই দুর্ঘটনার কারণে বছরে কতগুলো পরিবার নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে এই তথ্য মোটেও কম নয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের শত শত মানুষ বিশেষ করে অসংখ্য শিশু মারা গেছে। আবার ইরানের ছোড়া মিসাইলে ইসরায়েলের হতাহতের সংখ্যাও কম নয়। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এই তো সেই দিন পাকিস্তানের হাসপাতালে বোমা হামলায় চার শতাধিক মানুষ মারা গেছে।
দুনিয়াব্যাপী এখন আঞ্চলিক যুদ্ধ আধুনিক সভ্যতার অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। কত নিখুঁতভাবে মানুষ হত্যা করা যায় তার জন্য কত উন্নত প্রযুক্তির যুদ্ধাস্ত্র বানানো যায়, মানুষের বিপুল পরিমাণে মেধা, শ্রম ও অর্থ সেই জন্য ব্যয় হচ্ছে। সেই যুদ্ধাস্ত্রের বাজার তৈরির জন্য নানা ছুতায় আবার হচ্ছে যুদ্ধ। যুদ্ধ মানেই নিরীহ মানুষের জীবনহানি, আবার পরোক্ষভাবে লাখ লাখ মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার আয়োজন।
বিভিন্ন দেশে মিসাইলের আঘাতে হতাহতের ঘটনা ঘটছে, আর আমাদের দেশে প্রতিবছর শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে সড়কপথে বা নৌপথে দুর্ঘটনায়।
এই যুদ্ধ থামানো বা এই যুদ্ধের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার আমাদের কোনো সামর্থ্য নেই। আমাদের দেশে মিসাইল হামলা নেই, ড্রোনের আঘাত নেই, বোমারু বিমান থেকে গোলা নিক্ষেপ হচ্ছে না—কিন্তু আছে মৃত্যুর ঘটনা। কিন্তু আমাদের সড়ক বা নৌপথে এই মৃত্যুর মিছিলের দায় কার? বছরের পর বছর মৃত্যুর মিছিল কি বাড়তেই থাকবে? এই ধরনের মৃত্যুকে কি নিছক দুর্ঘটনা বলা যাবে?
সড়ক বা নৌপথে এই দুর্ঘটনা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, অনেক সভা-সেমিনার হয়েছে। দিস্তায় দিস্তায় সুপারিশ জমা পড়ে আছে। ঘটনার পর সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের তৎপরতা দেখা গেলেও পরে তা হারিয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনাগুলোকে নিছক দুর্ঘটনা বলা যাবে না, এগুলো হচ্ছে ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’। চাইলে এই কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা যায়।
নদীতে শত শত যাত্রী নিয়ে লঞ্চ ডুবির পর আমরা জানতে পারি ওই লঞ্চের ফিটনেস ছিল না। জানতে পারি লঞ্চ চালাচ্ছিল শিক্ষানবিশ বা হেল্পার। আবার সড়ক দুর্ঘটনার পর জানতে পারি গাড়ি ড্রাইভারের পরিবর্তে হেল্পার চালাচ্ছিলেন, গাড়িরও ফিটনেস নেই। আবার ড্রাইভার চালালেও ওই ড্রাইভারের কোনো বিশ্রাম বা বিরতি ছিল না।
আলোচিত দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও ১. গাড়ির ফিটনেস ছিল কি না, ২. গাড়ি ছাড়ার আগে চেক করা হয়েছিল কি না, ৩. ড্রাইভার যথেষ্ট বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছিল কি না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের মধ্যে দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে।
বছরের পর বছর এই কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড হয়ে আসলেও এর কোনো প্রতিকার নেই কেন? এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এই বাস বা লঞ্চের মালিক যারা, তারা সরাসরি সরকারি দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলে এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া কখনোই সম্ভব হয় না দলীয় সরকারগুলোর।
সরকার হতাহতের পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছে; এটা ভালো কথা, কিন্তু সড়কে তাজা প্রাণ ঝরা বন্ধ করতে এটা যথেষ্ট নয়।
অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর বিএনপি সরকার গঠন করেছে, বিএনপির প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়ে মানুষ আশাবাদী। অতীতের মতো কিছু দলীয় ব্যবসায়ীর স্বার্থে বিষয়গুলোকে ধামাচাপা দেওয়া মানুষ আশা করে না।
বিগত সময়ে লঞ্চ দুর্ঘটনায় বিএনপি সরকারের নৌমন্ত্রীর একটি বেফাঁস মন্তব্যে বিএনপিকে কী পরিমাণে অজনপ্রিয় হতে হয়েছিল এই কথা ভুলে গেলে চলবে না। অন্যদিকে ২০১৮ সালে যে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন শুরু করেছিল স্কুলের ছেলেমেয়েরা, তাদের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনকে বিদায় নিতে হয়েছে।
আমরা আশা করব, সরকার কিছু ব্যবসায়ীর খামখেয়ালিকে প্রশ্রয় না দিয়ে জনগণের পক্ষে দাঁড়াবে, সড়কে এই হত্যা বন্ধে উদ্যোগ নেবে।