প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে চলমান পরিস্থিতির সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করছে ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করতে পারে কি না, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে পারে কি না এবং আরেকটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে পারে কি না তার ওপর। ইরান বর্তমানে কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে পারস্য উপসাগর দিয়ে তেল সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নিয়ে কীভাবে কাজ করা উচিত, তা বুঝতে তুর্কি ইতিহাস একটি সতর্কতা এবং সমাধানের পথ দেখাতে পারে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য হলো দারদানেলিস প্রণালীর ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ, যা ইজিয়ান সাগরকে মারমারা সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে এবং পরবর্তীতে বসফরাস ও কৃষ্ণসাগরের সাথে যুক্ত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হিসেবে পরিচিত। বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ঠিক এই কারণেই সামরিক উপায়ে এই সমস্যার সমাধানের চিন্তা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
কাগজে-কলমে দেখলে কোনো 'চক পয়েন্ট' বা সরু জলপথ জয়ের পরিকল্পনা সহজ মনে হতে পারে, বিশেষ করে সেই পরাশক্তির জন্য যাদের প্রতিপক্ষের তুলনায় ব্যাপক প্রযুক্তিগত ও সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। ওয়াশিংটনের যুদ্ধ পরিকল্পনাকারীদের কাছে একটি সংকীর্ণ জলপথ কেবল সামরিক শক্তির মাধ্যমে সমাধানযোগ্য একটি কারিগরি সমস্যা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে, কৌশলগত জলপথগুলো কেবল ভৌগোলিক বাধা নয়, এগুলো সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতার ভারসাম্যের একটি পরীক্ষা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেন এবং ফ্রান্স এটিই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল, যখন তারা অটোমান সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে থাকা দারদানেলিস প্রণালী জোর করে দখলের চেষ্টা চালিয়েছিল। ১৯১৫-১৬ সালের সেই গ্যালিপলি অভিযান ছিল ব্রিটিশ অ্যাডমিরালটির ফার্স্ট লর্ড উইনস্টন চার্চিলের মস্তিষ্কপ্রসূত পরিকল্পনা। অটোমানরা তখন জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়েছিল এবং তাদের দুর্বল মনে করা হয়েছিল। ব্রিটেনের লক্ষ্য ছিল প্রণালীটি উন্মুক্ত করা, অটোমানদের যুদ্ধ থেকে ছিটকে দেওয়া এবং রাশিয়ার জন্য সরবরাহ রুট সচল করা। কিন্তু এই অভিযান মিত্রশক্তির জন্য যুদ্ধের অন্যতম রক্তক্ষয়ী বিপর্যয়ে পরিণত হয়। এতে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ নিহত হন—যার মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার মিত্রশক্তির সেনা এবং অন্তত ৮৬ হাজার অটোমান সৈন্য ছিল। এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে চার্চিলকে তার পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল।
তুর্কিদের স্মৃতিতে গ্যালিপলি একটি জাতির জন্মের গল্প। অটোমান কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল, যিনি পরবর্তীতে আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা আতাতুর্ক হিসেবে পরিচিত হন, তিনি এই প্রণালী রক্ষার মাধ্যমেই নিজের পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন। প্রণালীর পাশের একটি শহরের নাম উল্লেখ করে এখনো সেখানে স্লোগান দেওয়া হয়, ‘কানাক্কালে পাস করা সম্ভব নয়’ (‘Canakkale cannot be passed’)।
লেখক: ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের একজন ফেলো এবং প্রতিষ্ঠানটির তুরস্ক প্রকল্পের পরিচালক।
অনুবাদ: নজরুল ইসলাম নয়ন