দুবাই বন্দরে কুয়েতি তেলবাহী ট্যাংকারে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলা এবং পরবর্তী তথ্যের ওপর কড়াকড়ি মধ্যপ্রাচ্যের এই জাঁকজমকপূর্ণ নগরীর নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত মঙ্গলবার ‘আল সালমি’ নামক ট্যাংকারটিতে তেহরানের পক্ষ থেকে বড় ধরনের আঘাত আসার পর হরমুজ প্রণালিতে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে জাহাজটি ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ক্রু সদস্যদের উদ্ধার করে।
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই বন্দরে এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনার পরও কোনো স্পষ্ট ছবি বা ভিডিও প্রকাশ্যে না আসায় বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। স্মার্টফোনের যুগে যেখানে যেকোনো ঘটনার খবর মুহূর্তেই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে দুবাইয়ের মতো উন্মুক্ত ও আধুনিক শহরে গণমাধ্যমের এই ‘ব্ল্যাকআউট’ রহস্যজনক। কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ঘটনার অনেক পরে একটি ঝাপসা স্থিরচিত্র প্রকাশ করলেও ড্রোন হামলার সময়কার কোনো দৃশ্য জনসমক্ষে আসেনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ তথ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। সাইবার অপরাধ আইনের দোহাই দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার কোনো ছবি কিংবা তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে ২০ হাজার থেকে ২ লাখ দিরহাম জরিমানা ও ২ বছরের জেলের বিধান কার্যকর করা হয়েছে। এমনকি গত ১২ মার্চ একটি আবাসিক ভবনে ড্রোন আঘাত হানার ঘটনায় পরিবারের কাছে ছবি পাঠানোয় তিন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বেসরকারি সংস্থা ‘ডিটেইনড ইন দুবাই’-এর তথ্যমতে, নিরাপত্তা বাহিনীর এই কঠোর নজরদারি থেকে সাধারণ কর্মী থেকে শুরু করে ধনাঢ্য বিনিয়োগকারী কেউই বাদ পড়ছেন না।

দুবাইয়ের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল শামসি এই কড়াকড়িকে জনমনে আতঙ্ক রোধের কৌশল হিসেবে দাবি করলেও গণমাধ্যম অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা সিপিজে অভিযোগ করেছে, আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের ওপর তথ্য প্রকাশ না করতে প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হচ্ছে। ফলে শহরটিকে ‘বিশ্বের নিরাপদতম স্থান’ হিসেবে প্রচার করা ইনফ্লুয়েন্সারদের উজ্জ্বল গল্পের আড়ালে এখন হাজার হাজার বিদেশি বাসিন্দার আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা চাপা পড়ে আছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, দুবাইয়ের এই কৃত্রিম ভাবমূর্তি মূলত কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ওপর দাঁড়িয়ে। ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দা বা ২০২৪ সালের বন্যার মতো চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠলেও বর্তমান যুদ্ধকালীন তথ্য সেন্সরশিপ দেশটির ‘উদার’ ভাবমূর্তিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, একের পর এক ড্রোন হামলা দুবাইয়ের নিরাপত্তার যে মিথ তৈরি হয়েছিল তা ভেঙে দিচ্ছে। এ অবস্থায় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেয়ে তথ্য গোপনের এই নীতি দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
টাইম ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
অনুবাদ: নজরুল ইসলাম নয়ন