লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের বসতঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দুর্বৃত্তায়ন বা মবের অস্তিত্বের বিষয়ে কোনো বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ পায়নি পুলিশ।
শনিবার (২০ ডিসেম্বর) রাতে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী।
অন্যদিকে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেন গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, তার ঘরের দুই দরজায় তালা লাগিয়ে কে বা কারা আগুন দিয়েছে। এ ঘটনায় তার আট বছর বয়সী সন্তান আয়েশা আক্তারের মৃত্যু হয়।
জেলা পুলিশের মিডিয়া সেলে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগুনের ঘটনায় বেলাল হোসেন বা তার পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে কিছু ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে, কতিপয় দুর্বৃত্ত সংঘবদ্ধ হয়ে মব সৃষ্টি করে ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। তবে প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাস্থলে কোনো দুর্বৃত্তকারী বা মবের অস্তিত্বের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এতে আরও বলা হয়, আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারাও এখন পর্যন্ত আগুনের উৎস বা আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশে জেলা পুলিশ জানায়, ইলেকট্রনিক বা প্রিন্ট মিডিয়ার কোনো সাংবাদিকের কাছে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য বা সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশকে সরবরাহ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে বেলাল হোসেনের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, কে বা কারা সামনের দরজায় তালা লাগিয়ে আগুন দিতে পারে, এমন আশঙ্কা তিনি প্রকাশ করেছেন।
বেলালের মা ও প্রত্যক্ষদর্শী হাজেরা বেগমের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, তিনি অন্য একটি ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন।
হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে বের হয়ে দেখেন বেলালের থাকার ঘরে আগুন জ্বলছে। পরে উপস্থিত লোকজনের সহায়তায় তার নাতনি স্মৃতি আক্তার ও বিথি আক্তারকে উদ্ধার করতে পারলেও ছোট
নাতনি আয়েশা আক্তারকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তিনি ঘটনাস্থলে কোনো দুর্বৃত্ত বা মব সৃষ্টিকারী কাউকে দেখতে পাননি। বেলালের ভাতিজা ও প্রত্যক্ষদর্শী মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুও একই বক্তব্য দেন।
লক্ষ্মীপুর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার রনজিত কুমার সাহা বলেন, কমলনগর উপজেলা ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়াহিদ পারভেজ বলেন, ঘটনাটি তদন্তাধীন। এখনো কোনো মামলা হয়নি। কে বা কারা আগুন লাগিয়েছে বা কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা উদ্ঘাটনে আমরা কাজ করছি।
এদিকে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেন লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার দগ্ধ দুই মেয়ে স্মৃতি আক্তার ও বিথি আক্তারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বেলাল হোসেন জানান, ঘরের দুই দরজায় দুইটা তালা মেরে আগুন লাগানো হয়েছে। তিনি ঘর থেকে স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে বের হতে পেরেছেন। তাদের তিন মেয়ে অন্য রুমে ঘুমাচ্ছিল। দুইজনকে বের করতে পারলেও পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পুরো ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। একজনের শরীরের এক-তৃতীয়াংশ এবং আরেকজনের প্রায় অর্ধেক পুড়ে গেছে। ছোট মেয়েকে (আয়েশা আক্তার) তিনি উদ্ধার করতে পারিনি। সে ঘটনাস্থলেই পুড়ে মারা গেছে।
সন্তান হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আয়েশার মা নাজমা আক্তার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ঘরের উত্তর পাশে ভিটায় পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। আগুন জ্বলতে জ্বলতে দরজার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। পুরো ঘর পুড়ে গেছে, কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমার কলিজার টুকরা আয়েশাও পুড়ে গেছে।
এই নৃশংস ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এক শোক বিবৃতিতে তিনি বলেন, দুর্বৃত্তদের অগ্নিসন্ত্রাসে শিশু আয়েশার অকাল মৃত্যু এবং তার দুই বোনসহ পিতা বেলাল হোসেনের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় শোক প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই। এটি একটি জঘন্য, অমানবিক ও কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী হামলা, যা বিরোধী রাজনৈতিক মত দমনের ধারাবাহিকতার বহিঃপ্রকাশ।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ঘটনা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ও রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়াবহতা তুলে ধরে। অবিলম্বে এই পৈশাচিক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
এ সময় তিনি নিহত শিশু আয়েশা আক্তারের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং আহতদের আশু সুস্থতা কামনা করেন। শোকসন্তপ্ত পরিবারসহ আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান বিএনপি মহাসচিব।
উল্লেখ্য, শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) গভীর রাতে সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বেলাল হোসেনের ঘরে আগুন লাগে। এতে তার আট বছর বয়সী মেয়ে আয়েশা আক্তার মারা যায় এবং তার দুই মেয়ে স্মৃতি আক্তার (১৭) ও বিথি আক্তার (১৪) দগ্ধ হয়।