ফরিদপুরে নগরবাউলখ্যাত জেমসের কনসার্ট পণ্ড হয়ে গেছে। ফরিদপুর জিলা স্কুলের ১৮৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠান ও পুনর্মিলনীর শেষ দিনে বহিরাগতদের ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও বিশৃঙ্খলার কারণে শুক্রবার রাতের কনসার্ট বাতিল করা হয়। ঘটনার সময় মঞ্চে ছিলেন অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক শ্রাবণ্য তৌহিদা।
জেলা স্কুল সূত্র জানায়, ১৮৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের প্রথম দিনে ব্যান্ড ওয়ারফেজ গান পরিবেশন করে। দ্বিতীয় দিনের মূল আকর্ষণ ছিল নগরবাউল জেমসের কনসার্ট। তবে কনসার্ট শুরুর আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে অনুষ্ঠান অসমাপ্ত রেখেই শিল্পী ও উপস্থাপকেরা ঢাকায় ফিরে যান।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে শ্রাবণ্য তৌহিদা বলেন, ‘পুরো ঘটনাটা আমি নিজের চোখে দেখেছি। সত্যিই ভয়ংকর পরিবেশ ছিল। ঢাকায় ফিরে এলেও সেই ট্রমা এখনো কাটেনি।’ তিনি জানান, আয়োজনের ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি ছিল না। প্রথম দিনের অনুষ্ঠান সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়। দ্বিতীয় দিনও সবকিছু ঠিকঠাক এগোচ্ছিল।
শ্রাবণ্য বলেন, ‘নগরবাউল জেমস পারফর্ম করবেন—এ নিয়ে সবার ভীষণ আগ্রহ ছিল। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে আমি র্যাফেল ড্র পরিচালনা করছিলাম। হঠাৎ বাইরে থেকে চিৎকার-চেঁচামেচি শোনা যায়। আয়োজকেরা বারবার জানাচ্ছিলেন, বহিরাগতদের জন্য বাইরে বড় পর্দার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও অনেকে দেয়াল টপকে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘যতই শান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছিল, ততই ইটপাটকেল ছোড়া বাড়তে থাকে। হঠাৎ একটি বড় ইট মঞ্চে, ঠিক আমার সামনে এসে পড়ে। এরপর দেখি শত শত মানুষ দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকছে। স্কুলের তরুণেরা তাদের থামানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ইটপাটকেল আরও বাড়ে, আমাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত কনসার্ট বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’
দীর্ঘদিন উপস্থাপনায় যুক্ত শ্রাবণ্য তৌহিদা বলেন, তাঁর কর্মজীবনে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনো হতে হয়নি। ‘আমরা বাংলাদেশকে ভালোবাসি। সুস্থ মস্তিষ্কের কেউ এমন ঘটনার পক্ষে থাকতে পারে না। দেশের নানা প্রান্ত ও বিদেশ থেকে সাবেক শিক্ষার্থীরা এসেছিলেন। নবীন-প্রবীণ সবার উচ্ছ্বাস কয়েক মুহূর্তেই আতঙ্কে রূপ নেয়। আমি নিরাপদে বাসায় ফিরেছি ঠিকই, কিন্তু মনে একটা কালো দাগ থেকে গেছে,’ বলেন তিনি।
শ্রাবণ্য আরও জানান, শোনা গেছে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের চেষ্টা করছিল। বিশৃঙ্খলার মধ্যে ১৫ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী আহত হন, অনেকের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে শিল্পী, আয়োজক ও দর্শকেরা অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে অপেক্ষা করেন। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা পারিশ্রমিক পেয়েছি, জেমস ভাইও পেয়েছেন। কিন্তু টাকা কখনো মানসিক আঘাত সারাতে পারে না। আহতদের কষ্ট বা হাজারো দর্শকের ভাঙা আশা টাকায় পূরণ হয় না। যারা ভালোবাসা আর সংগীতের টানে এসেছিলেন, তারা শুধু ভয় আর হতাশা নিয়ে ফিরেছেন। এই ঘটনাটি সত্যিই হৃদয়বিদারক ও গভীরভাবে হতাশাজনক।’