বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের জেএফ-১৭ ‘থান্ডার’ যুদ্ধবিমান বিক্রিসহ সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে এই আলোচনা প্রতিবেশী ভারতকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের এই যোগাযোগকে নয়াদিল্লি আঞ্চলিক নিরাপত্তা হিসাবের জন্য স্পর্শকাতর হিসেবে দেখছে।
পাকিস্তান সফররত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন ও পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধুর মধ্যে বৈঠকে জেএফ-১৭ ‘থান্ডার’ যুদ্ধবিমান সংগ্রহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে বুধবার রয়টার্স জানিয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অস্ত্র রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করাই এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য।
জেএফ-১৭ ‘থান্ডার’ একটি হালকা, এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট আধুনিক মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান। এটি পাকিস্তানের এরোনটিক্যাল কমপ্লেক্স ও চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি। বিমানটি দিন-রাত ও সব ধরনের আবহাওয়ায় আকাশ নজরদারি, স্থল আক্রমণ এবং শত্রু বিমান প্রতিহত করতে সক্ষম। চীনে এই যুদ্ধবিমানটি এফসি-১ ‘জিয়াওলং’ নামে পরিচিত, যার অর্থ ‘ভয়ংকর ড্রাগন’। পাকিস্তান দাবি করে, গত বছর ভারত–পাকিস্তান সংঘাতের সময় এই যুদ্ধবিমান ব্যবহারে তারা কার্যকর সাফল্য পেয়েছে।
পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, আলোচনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে দ্রুতগতির ‘সুপার মুশশাক’ প্রশিক্ষণ বিমান সরবরাহের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাইলট প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং রক্ষণাবেক্ষণ–সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
এই আলোচনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর ঢাকা–নয়াদিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ওই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগও বেড়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর এই প্রথম দুই দেশ সরাসরি বাণিজ্য পুনরায় শুরু করেছে। একই সঙ্গে সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক এই সফর ও আলোচনা দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে নতুনভাবে জোরদার করেছে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জেএফ-১৭ বর্তমানে পাকিস্তানের অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আজারবাইজানের সঙ্গে সামরিক চুক্তি এবং লিবিয়ার ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তিতেও এই যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সম্প্রতি দাবি করেছেন, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষাশিল্পের সাফল্য দেশটির অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তার ভাষায়, পাকিস্তানের তৈরি যুদ্ধবিমানগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত এবং বড় অঙ্কের অর্ডার আসছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও জেএফ-১৭ কেনার বিষয়ে আগ্রহের ইঙ্গিত মিলেছে। গত বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের একটি সামরিক প্রতিনিধিদল পাকিস্তান সফরে গিয়ে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে। প্রতিনিধিদলের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ আধুনিক মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
গত বছর রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এলাকায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফ-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় পুরোনো যুদ্ধবিমান ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ওই দুর্ঘটনায় অন্তত ৩১ জন নিহত এবং দেড় শতাধিক আহত হন। ঘটনার পর জনমনে প্রশ্ন ওঠে, কেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এখনো পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করছে। এই প্রেক্ষাপটেই জেএফ-১৭ ‘থান্ডার’ কেনার আলোচনা আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহ বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত, যা বাস্তবায়িত হলে ঢাকা–নয়াদিল্লি–ইসলামাবাদ—এই তিন পক্ষের সম্পর্কের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতে উদ্বেগ কেন—এ প্রশ্নে দেশটির গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের বরাতে বলছে, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সময়ের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভ্যাস, অভিন্ন মতবাদ এবং পারস্পরিক সক্ষমতা বাড়ায়। পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর সঙ্গে এমনকি সীমিত প্রশিক্ষণ বিনিময়ও ভারতের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষ করে এমন এক অঞ্চলে যেখানে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিরুদ্ধে অসম ও প্রক্সি কৌশল ব্যবহার করে আসছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ যদি সামরিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়, তবে তা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা হিসাবকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এ ছাড়া একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক বার্তার দিকেও নজর দিচ্ছে ভারত। পাকিস্তান যদি বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সফল হয়, তবে রাওয়ালপিন্ডির এই দাবি আরও জোরালো হবে যে, তাদের আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক একঘরে অবস্থার অবসান ঘটছে। এই বয়ান আঞ্চলিক ফোরাম এবং ইসলামি বিশ্বে ভারতের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক যোগাযোগ বাড়াকে ভারত আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি ‘স্পষ্ট সতর্ক সংকেত’ হিসেবে দেখছে। ভারতের মূল্যায়নে, প্রতিবেশী অঞ্চলে পাকিস্তান যখনই কৌশলগত জায়গা করে নেয়, তখনই তা আগ্রাসীভাবে ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়।