নতুন কাঠামোয় সাত কলেজ
দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা, শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন এবং নানা বিতর্কের অবসান ঘটাতে ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজকে নিয়ে পৃথক একটি বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রস্তাবিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’। এর জন্য প্রণীত অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ।
এক বছরের বেশি সময় ধরে আলোচনা, সমালোচনা ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঢাকার সাতটি বড় সরকারি কলেজকে একীভূত করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায় সরকার। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অধ্যাদেশের খসড়াটি অনুমোদিত হয়।
অধ্যাদেশ জারি হলে ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ এবং সরকারি তিতুমীর কলেজ—এই সাতটি প্রতিষ্ঠান নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত কলেজ হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। পাশাপাশি ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির নিজস্ব একাডেমিক কার্যক্রমও চালু থাকবে। এতদিন এসব কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল।
বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। একই সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
ঢাকার সাত কলেজকে ঘিরে সংকটের সূচনা হয় ২০১৭ সালে, যখন পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই কলেজগুলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। এতে প্রশাসনিক ও একাডেমিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত বছরের জানুয়ারিতে কলেজগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা করার ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে সরকার নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের উদ্যোগ নিলেও কাঠামো নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। এ অবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় অধ্যাদেশের খসড়া পুনরায় সংশোধন করে, যা এবার অনুমোদন পেল।
প্রেস উইং জানায়, এই অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য হলো সাতটি কলেজকে একটি অভিন্ন একাডেমিক কাঠামোর আওতায় এনে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অচলাবস্থার অবসান ঘটানো। কলেজগুলোর নিজস্ব পরিচয়, অবকাঠামো ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ওপর তাদের অধিকার অক্ষুণ্ন থাকবে।
সংশোধিত খসড়ায় আগের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতিটি কলেজে স্কুলভিত্তিক শিক্ষা কাঠামোর পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়েছে। নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে আচার্য, উপাচার্য, সিনেট, সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলসহ পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকবে। রাষ্ট্রপতি আচার্যের দায়িত্ব পালন করবেন এবং সিনেট মনোনীত প্যানেল থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেবেন। শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারক করবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলা, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, আইন ও চারুকলা বিভাগসহ পৃথক স্কুল থাকবে, যার নেতৃত্ব দেবেন হেড অব স্কুল। সংযুক্ত কলেজগুলোতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা কার্যক্রম অভিন্ন সময়সূচি ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল এবং কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মূল ক্যাম্পাস কিংবা সংযুক্ত কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রাম, শিক্ষক উন্নয়ন এবং উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ কিংবা বিশেষ চাহিদার ভিত্তিতে কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই দেশি ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি ও ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।
অধ্যাদেশে আবাসিক হল সুবিধা, ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম চালুর বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত অস্থায়ী ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগও রাখা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ মনে করছে, এই সিদ্ধান্ত ঢাকার সাত কলেজের দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং রাজধানীতে একটি আধুনিক, সমন্বিত ও গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা পরিবেশ গড়ে তুলবে।