১৩ বছর আগে গুমের পর বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীকে হত্যা করা হয়েছে—এমন তথ্য তদন্তে পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
গুম ও হত্যার অভিযোগে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মামলায় আজ বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিলের পর সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান। তাজুল ইসলাম বলেন, তদন্তে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে এক শর বেশি মানুষকে গুমের পর হত্যার অভিযোগ এসেছে।
এম ইলিয়াস আলী ছিলেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। ছাত্রদলের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক সিলেট-২ আসন থেকে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১২ সালের এপ্রিলে ঢাকার বনানীতে বাসার কাছ থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয়। এরপর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলে অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত শুরু করে। এসব গুম-খুনের ঘটনায় র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানকে অন্যতম ‘কুশীলব’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সেনাবাহিনীর চাকরি হারিয়ে গ্রেপ্তার হন জিয়াউল আহসান। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার অনুসন্ধানে ইলিয়াস আলীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে গুম করার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানান প্রধান প্রসিকিউটর।
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ইলিয়াস আলীকে রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া হয়, এরপর তাকে গুম করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে হত্যা করা হয়েছে—এমন তথ্য তদন্তে পাওয়া গেছে।’
প্রধান প্রসিকিউটর আরও জানান, ২০১৫ সালে বিএনপির তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব (বর্তমান স্থায়ী কমিটির সদস্য) সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম করে ভারতে পাচার করার ঘটনাতেও জিয়াউল আহসানের ভূমিকা ছিল। পাশাপাশি ২০১৩ সালে ঢাকার তেজগাঁও থানার বিএনপি নেতা সাজিদুল ইসলাম সুমনসহ আটজনকে তুলে নেওয়ার ঘটনাটি তার নির্দেশ ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সংঘটিত হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা গোলাম কিবরিয়া মিহিন, হাফেজ জাকির ও চৌধুরী আলমসহ কয়েকটি আলোচিত গুমের ঘটনার পরিকল্পনাকারী হিসেবেও জিয়াউল আহসানের নাম এসেছে বলে জানান তাজুল ইসলাম।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উপস্থাপনের পর ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেয়। তাজুল ইসলাম জানান, গুমের তদন্তে মোট ৫০০ মানুষকে হত্যার বিষয়ে প্রসিকিউশনের কাছে তথ্য এসেছে।
উল্লেখ্য, ইলিয়াস আলীসহ বিরোধী দলের নেতাদের গুমের ঘটনায় আওয়ামী লীগ আমলে সরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সে সময় সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থাই দায় স্বীকার করেনি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা এসব অভিযোগকে ‘নাটক’ বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন।
জিয়াউল আহসান ১৯৯১ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ২০০৯ সালে মেজর পদে থাকাকালে তিনি র্যাব-২-এর উপ-অধিনায়ক হন। পরে র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হন। ২০১৬ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পদোন্নতি পেয়ে তিনি কিছুদিন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-এর পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন।
২০১৭ সালে তাকে টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)-এর পরিচালক করা হয়। ২০২২ সালে সেখানে মহাপরিচালক পদ সৃষ্টি করে তাকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি পান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত বছর ৬ আগস্ট তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।