নওগাঁর সাপাহার সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) শ্যামলী রানী বর্মণের বিরুদ্ধে এক বাসচালককে কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। স্বামীর সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে গত রোববার রাতে ওই চালককে মারধর করা হয় বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী। পরে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। হাসপাতালের ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে—‘ফিজিক্যাল অ্যাসল্ট। পুলিশ কেস।’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, গত সোমবার দুপুরে আহত ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। আঘাতজনিত কারণে তাঁর শরীরে কালশিরার দাগ পাওয়া গেছে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এএসপি শ্যামলী রানী বর্মণের স্বামী জয়ন্ত বর্মণ একজন কলেজশিক্ষক। নির্যাতনের শিকার বাসচালকের নাম বাদল। তাঁর বাড়ি রাজশাহী নগরের পঞ্চবটি এলাকায়। ঘটনার পর বাসচালককে নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম)-এর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার বিকেলে রাজশাহীর শিরোইল বাস টার্মিনালে বাসচালক বাদলের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘রোববার রাতে সাপাহার জিরো পয়েন্টে বাস থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে এএসপির বডিগার্ড আমাকে সার্কেল অফিসে নিয়ে যান। সেখানে বডিগার্ড এসএস পাইপ দিয়ে গরু পেটানোর মতো পেটান। এএসপির স্বামী লাথি-ঘুষি মারেন, আর শ্যামলী রানী চড়-থাপ্পড় মারেন।’
বাদল জানান, আগামীকাল বৃহস্পতিবার তাঁকে নওগাঁয় ডাকা হয়েছে এবং সেখানে পুলিশ সুপার উপস্থিত থাকতে পারেন। সেখানে কী বলবেন—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি যা সত্যি, তাই বলব।’ ছবি তুলতে অনীহা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চারদিক থেকে চাপের মধ্যে আছি। তাই বাস টার্মিনালেও আসিনি। আজ বিকেলে একটু বের হয়েছি।’
এ ঘটনায় বাসের সুপারভাইজার, চালক ও বাস মালিক সমিতির এক নেতার ভিডিও বক্তব্য পাওয়া গেছে। ভিডিওতে বাসের সুপারভাইজার সিয়ামকে বলতে শোনা যায়, ‘রোববার একজন যাত্রী সাপাহার থেকে গাড়িতে ওঠেন। ওঠার পর আমি জিজ্ঞেস করি, ভাই কই যাবেন? তিনি বলেন, “ধানসুরা যাব।” আমি বলি, ভাই আমার গাড়িতে সিট হবে না, টিকিটের যাত্রী আছে। টিকিটের যাত্রী এলে সিট ছেড়ে দিতে হবে। টিকিটের যাত্রী এলে আমি বড় ভাইকে সিট ছেড়ে দিতে বলি। এই কথার পর তিনি খারাপ ভাষায় কথা বলেন। সামনে এসে বলেন, “তুই জানিস আমি কে? আমার বউ সাপাহারের এএসপি। তুই জানিস আমি তোর কী করতে পারি?” এরপর তিনি চালকের কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখতে চান এবং বিভিন্ন কথা বলে ধানসুরায় নেমে যান। কিছুক্ষণ পর আমার ফোনে কল আসে। ওপাশ থেকে বলা হয়, “আমি সাপাহার সার্কেলের এএসপি বলছিলাম।” তখন তিনি বাজে কথা বলে বলেন, “তোরা আয়, তোদের দেখছি।”’
রাজশাহী বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, এএসপি কার্যালয়ে ডাকা হলে বাদল তাঁকে ফোন করেন। তখন তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে এএসপির সঙ্গে কথা বলেন। এএসপি জানান, চালক দুর্ব্যবহার করেছে এবং তাকে একটু পাঠাতে বলেন। বিষয়টি মিটমাটের জন্য তিনি যেতে বলেছিলেন। তবে আধা ঘণ্টা পর বাদল ফোন করে জানান, ‘আমাকে প্রচণ্ড মেরেছে।’
অভিযোগের বিষয়ে এএসপি শ্যামলী রানী বর্মণ বলেন, ‘আমার স্বামীর সঙ্গে মুঠোফোনে অন কলে থাকা অবস্থায় খারাপ ব্যবহার করার বিষয়টি আমি নিজে শুনেছি। পরে ওই গাড়িচালক ও সুপারভাইজারকে রোববার রাতে অফিসে ডাকা হয়েছিল। চালক এসে সরি বললেও সুপারভাইজার আসেননি। পরে মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে। কাউকে মারধরের অভিযোগ সত্য নয়।’
এ বিষয়ে নজরুল ইসলাম সরাসরি মুঠোফোনে বলেন, বিষয়টির একটি সন্তোষজনক মীমাংসা হয়েছে। তবে বাসচালক বাদলের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাদল আমার কথার বাইরে যেতে পারবে না।’ আজ সকালে আবার যোগাযোগ করলে তিনি সন্তোষজনক মীমাংসা হয়েছে—এ কথা লিখে দেওয়ার জন্য তাগিদ দেন।