বর-কনেসহ ১৪ জনের মৃত্যু
বাগেরহাটের রামপালে বর-কনেবাহী মাইক্রোবাস ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নবদম্পতিসহ ১৪ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে একটি পরিবারের বিয়ের আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয়েছে এবং পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহতদের মধ্যে চারটি শিশু রয়েছে, যাদের মধ্যে দুই শিশুর বয়স দুই বছরেরও কম। গন্তব্যস্থল থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে থাকতে মাইক্রোবাসটির সাথে নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান এবং পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে বাকিদের মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনাস্থলের পাকা সড়কের ঢালজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য কাচের টুকরো এবং দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়ির খণ্ডাংশ। সেখানে ধুলোবালির মধ্যে পড়ে আছে শিশুদের জুতো ও একটি চুষনি, যা এই নিদারুণ ট্র্যাজেডির নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় উৎসুক জনতা শুক্রবার সকালেও দুর্ঘটনাস্থলে ভিড় করে এই ভয়াবহতা দেখে শিউরে উঠছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি মাঠ থেকে গরু নিয়ে ফেরার সময় হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পান। কাছে গিয়ে দেখেন রক্তমাখা মাইক্রোবাস ও মানুষের নিথর দেহ পড়ে আছে। তিনি বলেন, ‘জীবনে এত বড় দুর্ঘটনা আর দেখিনি; চারদিকে কেবল রক্ত আর আহত মানুষ ছড়িয়ে ছিল।’
নিহত বর আহাদুর রহমান ছাব্বির মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে ছিলেন। এ দুর্ঘটনায় আবদুর রাজ্জাক নিজে এবং তাঁর দুই ছেলে, এক মেয়ে, পুত্রবধূ ও চার নাতিসহ পরিবারের আট সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। এক নিমেষেই সাজানো গোছানো পরিবারটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।
আবদুর রাজ্জাকের বড় ছেলে আশরাফুল আলম জনি এই দুর্ঘটনায় নিজের বাবা, স্ত্রী, তিন সন্তান ও ভাইবোনদের হারিয়েছেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনায় স্ত্রী, এক ছেলে, দুই মেয়ে, দুই ভাই, বাবা ও বোনকে হারিয়েছি; আমার সব শেষ হয়ে গেছে।’ তাঁর এই বিলাপ শুনে উপস্থিত প্রতিবেশী ও স্বজনদের কেউই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
কাটাখালী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাফর আহমেদ জানান, পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দুটি রাতেই সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর নিহতদের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
নিহত ১৪ জনের মধ্যে ৯ জনের দাফন মোংলায়, ৪ জনের কয়রায় এবং মাইক্রোবাস চালকের দাফন রামপালে সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। গত বুধবার রাতে খুলনার কয়রায় বিয়ে সম্পন্ন করে নববধূর্তে নিয়ে মোংলার বাড়িতে ফেরার পথেই এই রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনা ঘটে। যেখানে নতুন বউকে বরণ করার উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই লাশের খাটিয়া আর স্বজনদের আর্তনাদ।