যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টার মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোর আরও ভূখণ্ড জবরদখল করছে ইসরায়েল। গাজা, সিরিয়া ও বর্তমানে লেবাননে ইসরায়েলের এই ‘বাফার জোন’ (নিরাপদ অঞ্চল) তৈরির পদক্ষেপকে তাদের রণকৌশলের বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইসরায়েলি সামরিক ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, আড়াই বছরের সংঘাতের পর ইসরায়েল এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছে যে হিজবুল্লাহ বা হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তাই প্রতিপক্ষকে তটস্থ রাখতে এবং সীমান্ত সুরক্ষিত করতে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর ভেতরে বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখার নীতি গ্রহণ করেছে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশেষজ্ঞ নাথান ব্রাউন বলেন, ইসরায়েলি নেতারা এখন এক ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’র সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, যেখানে বাফার জোন তৈরি করে প্রতিপক্ষকে ছত্রভঙ্গ রাখাই মূল লক্ষ্য।
দক্ষিণ লেবাননে ‘পোড়ামাটি নীতি’
সম্প্রতি দক্ষিণ লেবাননে লিতানি নদী পর্যন্ত বাফার জোন তৈরির লক্ষ্যে অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েল। এটি লেবাননের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৮ শতাংশ। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর লক্ষ্য হলো সীমান্ত থেকে ৫-১০ কিলোমিটার এলাকা পুরোপুরি ‘পরিষ্কার’ করা, যাতে হিজবুল্লাহর রকেট হামলা থেকে তাদের সীমান্তশহরগুলো নিরাপদ থাকে। এজন্য দক্ষিণ লেবাননের অনেক গ্রাম ও ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হচ্ছে। ইসরায়েলের দাবি, এসব বাড়ির ৯০ শতাংশই হিজবুল্লাহর অস্ত্র মজুত বা ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
নেতানিয়াহুর দম্ভোক্তি
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত ৩১ মার্চ এক ভিডিও বার্তায় দম্ভ করে বলেন, ‘আমরা আমাদের সীমান্তের অনেক গভীরে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেছি।’ তাঁর দাবি অনুযায়ী, গাজার অর্ধেক ভূখণ্ড এখন ইসরায়েলের দখলে। এছাড়া সিরিয়ার মাউন্ট হারমন থেকে ইয়ারমুখ নদী পর্যন্ত এবং লেবাননে বিশাল বাফার জোন তৈরি করা হয়েছে। ইসরায়েলের উগ্রপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এমনকি সীমান্ত লিতানি নদী পর্যন্ত বাড়ানোর এবং গাজায় পুনরায় বসতি গড়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন।
চাপে পড়বে সামরিক বাহিনী
ইসরায়েল দীর্ঘকাল ধরে পশ্চিম তীর, গাজা ও সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে রেখেছে। এখন নতুন করে লেবানন ও গাজার বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণে রাখায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তেল আবিবভিত্তিক ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এর গবেষণা পরিচালক ওফার শেলাহ সতর্ক করে বলেন, একসাথে লেবানন, গাজা, সিরিয়া ও পশ্চিম তীরে টহল দিতে গিয়ে সেনাবাহিনী হিমশিম খেতে পারে।
এদিকে, বেসামরিক ঘরবাড়ি ও সম্পদ ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের এরান শামির-বোরার জানান, সুনির্দিষ্ট সামরিক কারণ ছাড়া দক্ষিণ লেবাননের জনপদ ধ্বংস করা আইনসিদ্ধ হবে না। তবে ইসরায়েলের বর্তমান যুদ্ধবাজ সরকার এসব আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই তাদের ‘বাফার জোন’ নীতি বাস্তবায়ন করে চলেছে।